অনলাইন গেমের আড়ালে ‘জুয়ার আসর’
<![CDATA[
গেমিং অ্যাপ তৈরি ও ডেভলপের আড়ালে চলতো অনলাইন জুয়ার আসর। এই ফাঁদে পা দিয়ে হাজার হাজার টাকা হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। রাজধানীর উত্তরায় উল্কা গেমস লিমিটেড বিদেশে টাকা পাচার করে থাকতে পারে বলেও জানিয়েছে র্যাব। আটক করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের সিইও’সহ ৭ জনকে।
ভারতীয় ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ নামের একটি গেমস প্রস্তুত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছিল ‘উল্কা গেমস লি’। বৈধ অনুমোদন থাকলেও গেমসের আড়ালে অবৈধ উপায়ে চলছিল কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন।
র্যাব বলছে, তিন পাত্তি গোল্ডসহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাঠানোর মূলহোতা উল্কা গেমস লি. এর সিইও জামিলুর রশিদ জামিল। তিনি ‘হিরোজ অব ৭১’ নামে বাংলা জনপ্রিয় গেমস নির্মাতা। অর্থপাচারসহ নানা অভিযোগে এই রশিদ জামিলসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা চারটি ব্যাংকে রয়েছে ৮০ কোটি টাকা।
সোমবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে বাহিনীর আইন ও সংবাদমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ ব্যাপারে গণমাধ্যমকে জানান।
তিনি বলেন, রাজধানীর মহাখালী ও উত্তরা এলাকা থেকে গেমসের আড়ালে জুয়া পরিচালনার অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যাদের মধ্যে পাঁচজন ‘উল্কা গেমস লি.’ কর্মকর্তা এবং একজন এজেন্ট।
আরও পড়ুন: অনলাইন গেমসের টাকা যোগাতে অপহরণের নাটক সাজিয়ে ধরা!
কমান্ডার মঈন বলেন, দেশে অনলাইন ক্যাসিনোর মূল হোতা সেলিম প্রধানকে গ্রেফতারের পর র্যাব জোরালভাবে জুয়ার নজরদারি শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে র্যাব তথ্য পায়, কিছু ব্যক্তি দেশে গেমিং ডেভেলপমেন্টের নামে বিদেশি বিনিয়োগের আড়ালে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাঠাচ্ছে। এমন খবরে রাজধানীর মহাখালী ও উত্তরা এলাকা হতে তিন পাত্তি গোল্ডসহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার আড়ালে দেশের বাইরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা পাঠানোর মূলহোতা ও উল্কা গেমস লি. এর সিইওকে জামিলুর রশিদকে গ্রেফতার করা হয়।
এ ঘটনায় গ্রেফতার বাকিরা হলেন- সায়মন হোসেন, রিদোয়ান আহমেদ, রাকিবুল আলম, মুনতাকিম আহমেদ ও কায়েস উদ্দিন আহম্মেদ। তারা সকলেই প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোটা অঙ্কের বেতন নিতেন। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ, সিপিইউ, সার্ভার স্টেশন, হার্ড ডিস্ক, স্ক্যানার, ডিভিডি ড্রাইভ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, ডেভিট ও ক্রেডিট কার্ড এবং পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও নগদ টাকা জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাঠানোর কথা স্বীকার করেছে।
র্যাব জানায়, উল্কার এমডি জামিল রশিদ গেমসের আড়ালে জুয়ার কারবারির মাধ্যমে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হন। প্রতিষ্ঠান থেকে জামিল প্রতিমাসে দশ লাখ টাকা বেতন নিতেন। চড়তেন বিলাসবহুল গাড়িতে। তার স্ত্রী ও সন্তান দেশের বাইরে থাকেন।
উল্কা গেমস লি. এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জামিলুর রশিদ। ২০১৭ সালে পার্শ্ববর্তী দেশের একটি প্রতিষ্ঠান মুনফ্রগ ল্যাবের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে মুনফ্রগ ল্যাবের বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেড় লক্ষাধিক টাকা বেতনে নিযুক্ত হয়।
মুনফ্রগ ল্যাবের অনলাইন জুয়া অ্যাপ ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় গেমটিকে আরও ছড়িয়ে দিতে দেশে বৈধতার জন্য কতিপয় আইনজীবীর পরামর্শে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে জামিরুল রশিদ ‘উল্কা গেমস প্রা. লি.’ নামে একটি গেমিং ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেয়। ২০১৯ সালে মুনফ্রগের ০.০১ শতাংশ উল্কা গেমসকে প্রদানের মাধ্যমে দেশে গেমিং খাতে উন্নয়নের জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়। দেশে গেইম ডেভেলপমেন্টের অনুমোদন থাকলেও অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনোর অনুমোদন না থাকায় উল্কা গেমস বিভিন্ন ভুল তথ্য উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে আইনি বৈধতা প্রাপ্তির ব্যবস্থা করে। এভাবেই ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ যাত্রা শুরু করে শহর নগরে ছড়িয়ে পড়ে। উল্কা গেমসের যাত্রা গেমিং ডেভেলপমেন্টের উদ্দেশে শুরু হলেও তারা বস্তুত গেম ডেভেলপমেন্ট না করে তিন পাত্তি গোল্ডসহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থ দেশের বাইরে পাঠাচ্ছিল।
আরও পড়ুন: ই-অরেঞ্জের অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ
‘তিন পাত্তি গোল্ড’ মূলত একটি অ্যাপ যা মোবাইলে ডাউনলোড করে খেলা যায়। এই অ্যাপের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ মুনফ্রগ ল্যাবের কাছে রয়েছে। এই অ্যাপে ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ ছাড়াও রাখি, আন্দর বাহার ও পোকার নামেও অনলাইন জুয়ার গেমস রয়েছে। যে কোনো কাজের পাশাপাশি এই গেমস খেলতে পারা যাওয়ায় তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়। গেমসের রেজিস্ট্রেশনের পর একজন গ্রাহককে গেমস খেলার জন্য কিছু চিপস ফ্রি দেয়া হয়। পরবর্তীতে গেমস খেলার জন্য অর্থের বিনিময়ে চিপস কিনতে হয়। মূলত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে চিপস কিনে অর্থের লেনদেন হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫০ হজার কোটি চিপস বিক্রি হয় এবং প্রতি কোটি চিপস বিভিন্ন পর্যায়ে ৪৬-৬৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন বট প্লেয়ার/রোবট প্লেয়ারের মাধ্যমে মূল গেইমারদের কৌশলে হারিয়ে প্লেয়ারদের পরবর্তীতে আরও চিপস কিনতে উৎসাহিত করা হয়। দেশে ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ এর চিপস বিক্রয়ের কাজটি ১৪টি অফিসিয়াল ডিস্ট্রিবিউটর/এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছিল। এই সব ডিস্ট্রিবিউটরদের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও, প্রাইভেট টেবিল অপশনের মাধ্যমে অন্য প্লেয়ার কাছ থেকেও চিপস ক্রয় করা যেত। বর্তমানে ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ এ প্রায় ৯ লাখ নিয়মিত গেইমার রয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার চিপস বিক্রি হয় বলে জানা যায়।
]]>




