খেলা

আগুনের আর্তনাদ

<![CDATA[

গেল ৬ নভেম্বরের কথা। জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পেট্রোল বোমা, গাড়িতে আগুন এবং নির্বিচার জ্বালাও পোড়াওয়ে আহত ব্যক্তি এবং নিহতদের স্বজনরা অংশ নেন অনুষ্ঠানে। আহতরা তুলে ধরেন তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তাদের দু’য়েকজনের কথা উদ্ধৃত করতে চাই।

মাছরুহা জামান- ৫৩ বছরের গৃহবধূ। রাজনীতির আগুনে হারিয়েছেন স্বামী এবং কন্যাকে। নুরুজ্জামান পাপলু ছিলেন ঠিকাদার। ২০১৩ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে বোমা হামলায় মেয়ে মাইশাসহ পুড়ে মারা যান পাপলু। মাছরুহা বেগম জানান, সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া মাইশা দীর্ঘদিন ধরে বাবার কাছে বায়না ধরেছিল কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাবা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। তবে অস্থিরতা একটু কমলে, আন্দোলনের নামে আগুন সন্ত্রাস কিছুটা স্তিমিত হলে মেয়েকে নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেন পাপলু। বেড়ানো শেষে ফিরছিলেন ঢাকায়। কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী বাসটি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে এলে শেষ রাতের দিকে হঠাৎ পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে অন্ধকারের আততায়ী। মুহূর্তেই দাউদাউ ছড়িয়ে পড়ে বাসজুড়ে। আরো অনেকের সঙ্গে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যান নুরুজ্জামান পাপলু এবং তার কন্যা মাইশা।

জোছনা বেগম আরেক মধ্যবয়সী নারী। পুলিশ কনস্টেবল মো. বাবলু মিয়ার বিধবা স্ত্রী। কনস্টেবল বাবলু মিয়া কর্মরত ছিলেন গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার বামনডাঙ্গা পুলিশ ফাঁড়িতে। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার গুজব ছড়ায় জামায়াত শিবিরের কর্মীরা। সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে নামিয়ে দেয় মাঠে। শিবির সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করে বামনডাঙ্গা পুলিশ ফাঁড়ি। নারকীয় হামলায় হত্যা করে কনস্টেবল বাবলু মিয়াকে। বাবলুকে যখন হত্যা করা হয়, তার ছেলের বয়স তখন ছিল তিন। সেই ছেলে এখন বারো বছরের কিশোর। জোছনা বেগম প্রশ্ন তোলেন, কোন অপরাধে তার ছেলেকে বাবা হারা করা হলো? তিনি কেন বিধবা হলেন?

আরও পড়ুন : নিবন্ধন আবেদন এবং পাকিস্তানের প্রেতাত্মা

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার পাটরশি গ্রামের মো. সালাহউদ্দীন ভুঁইয়া কাজ করতেন এলিফফ্যান্ট রোডের একটি জুতার দোকানে। ২০১৪ সালের ২৮ জানুয়ারি গ্লোরি পরিবহনের বাসে ছিলেন সালাহউদ্দীন। বাসটি যাত্রাবাড়ির কোনাবাড়ি এলাকায় আসতেই আচমকা ছুঁড়ে মারা হয় পেট্রোল বোমা। মুহূর্তেই জ্বলে ওঠা দাউদাউ আগুনে আরো অনেকের সঙ্গে দগ্ধ হন সালাহউদ্দীন। কোনো অজানা অপিরিচিত সুহৃদ তাকে নিয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। চিকিৎসায় প্রাণে বাঁচেন সালাহউদ্দীন। কিন্তু মুখটা ভয়াবহভাবে পুড়ে যাওয়ায় আর স্বাভাবিক হয়নি তার চেহারা।

সেদিন জাতীয় জাদুঘরের বঙ্গমাতা মিলনায়তনে আরো হাজির ছিলেন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ট্রাকচালক, ফুটপাতের দোকানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। সবাই পুড়েছেন আন্দোলন নামের সন্ত্রাসের আগুনে।

এমন আরো অনেকের কান্নায়, আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে মিলনায়তনের বাতাস। নিহতদের স্বজন এবং আহতদের কান্নার সঙ্গে মিশে যায় প্রধানমন্ত্রী, বিদেশি কূটনীতিক এবং উপস্থিত সব মানুষের চোখের জল।

টিভির পর্দায় এই দৃশ্য দেখে আমি ফিরে গিয়েছিলাম ২০১৩ থেকে ২০১৫’র সেই আগুন সন্ত্রাসের দিনগুলোতে। তখন ভোরের আলো ফোটার অনেক আগে বের হতাম বাসা থেকে। বেশিরভাগ সময় ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামলে শুনতে পেতাম ফজরের আজান। এরপর ক্যামেরা নিয়ে বের হয়ে পড়া। শহরের নানা জায়গা ঘুরে হরতাল অবরোধ জ্বালাও-পোড়াওয়ের খবর সংগ্রহ শেষে অফিসে ফিরে রিপোর্ট বানিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ৯টা সাড়ে ৯টা হয়ে যেত। এই ছিল তখনকার নিত্যদিনের চিত্র। তেমনই একদিনে বাসায় ফিরে গোসল-টোসল করে রাতের খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি- এমন সময় খবর এলো যাত্রাবাড়ি এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয়া হয়েছে। আহতদের নিয়ে আসা হচ্ছে ঢাকা মেডিকেলে। খাবার ফেলে ছুটলাম অফিসের দিকে। ক্যামেরা মাইক্রোফোন নিয়ে বের হয়ে যাই ঢাকা মেডিকেলের দিকে। বাংলামোটর থেকে ঢাকা মেডিকেল অল্প একটু পথ। যেতে বেশি সময় লাগে না। আমরা যখন হাসপাতালে পৌঁছাই তখনো আহতদের নিয়ে আসা হয়নি মেডিকেলে। দাঁড়িয়ে আছি ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগ আর বার্ন ইউনিটের সামনের ফাঁকা জায়গাটার পূবপাশে একটি গাছের নিচে। শীতের রাতে গাছ থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ছে শিশির। শীত লাগছে খুব। মনে মনে ভাবছি এককাপ চা পেলে খুব ভালো হতো। হঠাৎ কোত্থেকে এক চাওয়ালাকে নিয়ে হাজির হন সজীব ভাই। সজীব ভাই ছিলেন আমাদের ঢাকা মেডিকেল প্রতিনিধি। আহা রে সজীব ভাই! তিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে একটা চুমুক দিয়েছি দেই নাই। কানে আসে মানুষের তীব্র আর্তনাদ। চায়ের কাপ ফেলে এগিয়ে যাই আমরা। সচল হয়ে যায় আমার সহকর্মীর ক্যামেরা। দেখি পুরো শরীর আগুনে পোড়া এক মানুষ দৌড়ে ঢুকছেন বার্ন ইউনিটের দিকে। এই ভয়াবহ নৃশংস তাকিয়ে দেখা যায় না। চোখ রাখা যায় না সেদিকে। আবার পেশাদারিত্বের দায়বোধ থেকে সরে আসতেও পারি না। এরপর একের পর পর এক আসতে থাকে দগ্ধ মানুষ। আধপোড়া মানুষ। পুরোপোড়া মানুষ। আগুনে পুড়ে মাংস খুলে পড়ছে শরীর থেকে। ঝুলে আছে পুড়ে খুলে যাওয়া চামড়া। এমন নৃশংসতা, এমন ভয়াবহতা, এমন বর্বরতা- কেমন করে সহ্য হয়! মানুষ কেমন করে পারে আরেকজন মানুষের প্রতি এমন নির্দয় হতে! আমার বোধবুদ্ধি কাজ করে না। আমার মাথায় কিছুই ঢোকে না। ছবি-টবি নেয়া শেষ হলে রোবটের মতো ডাক্তারের ইন্টারভিউ করি। তথ্য জোগারের চেষ্টা করি। একটা সময় অফিসের দিকে যাত্রা করি।

আরও পড়ুন: বাহারি নামে ইসির নিবন্ধন চেয়েছে ১০০ সংগঠন

এমনিতে শীতের রাত তার ওপর হরতাল অবরোধের দিন। রাস্তাঘাট একেবারে নীরব সুনসান। গাড়ি চলছে ধীরে। তীব্র শীতের মধ্যেও আমার খুব গরম লাগতে শুরু করে। ঢাকা মেডিকেল থেকে দেড় দুই মিনিটের মধ্যে গাড়ি চলে আসে টিএসসি এলাকায়। আমি ড্রাইভারকে অনুরোধ করি- ভাই গাড়িটা একটু থামান। আমি নামব। গাড়ি থেকে নেমে আমি বসে পড়ি টিএসসির ফুটপাতে। আমার বমি বমি লাগে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর সঙ্গে থাকা চিত্রসাংবাদিক অফিসে ফেরার তাড়া দেন। রাত বাড়ছে। অফিস গিয়ে রিপোর্ট বানাতে হবে। তারপর আবার সকালে অফিস আছে। এরপর অফিসে এসে কি লিখেছিলাম, কি রিপোর্ট বানিয়েছিলাম আজ আর মনে নেই।

তবে এই ঘটনার পর থেকে রাতে আমার ঘুম হতো না। চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠতো শরীরের প্রায় সবটা আগুনে পোড়া একজন মানুষ দৌড়ে হাসপাতালে ঢুকছেন। হাসপাতালের মেঝেয় লুটিয়ে পড়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। 

লেখক: অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর, সময় টিভি।

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!