‘উন্নয়ন বাজেটের ৭৪ ভাগই পায় ঢাকাসহ ৬ জেলা’
<![CDATA[
দেশের উন্নয়ন বাজেটের ৭৪ ভাগই ঢাকাসহ ৬ জেলা পেয়ে থাকে বলে এক সমীক্ষা গবেষণায় জানা গেছে। পরিকল্পনাবিদ মো. রিদওয়ানুর রহমান ও অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ‘বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাজেট বরাদ্দের খাত ও জেলাভিত্তিক বিন্যাস’র ওপর এ সমীক্ষা গবেষণা পরিচালনা করেন।
বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার (৮ নভেম্বর) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল নগর সংলাপে সমীক্ষা গবেষণার সারাংশ উপস্থাপন করা হয়।
নগর সংলাপের মূল প্রবন্ধে আইপিডি’র নির্বাহী পরিচালক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক পরিকল্পনাবিদ ড.আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সমগ্র দেশের সুষম নগরায়ন নিশ্চিত করতে ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন কমানোর সাম্প্রতিক বেশ কিছু উদ্যোগ চলমান আছে। কিন্তু তারপরও দেখা যাচ্ছে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বেশ অঞ্চলে এখনও তুলনামূলক বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে। এমনকি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অর্থনৈতিক জোন তৈরির যে প্রয়াস চলমান আছে, সেখানেও এই এলাকাগুলোতেই বেশি কর্মসংস্থান হবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে সামনের দিনগুলোতে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও উন্নয়নে কেন্দ্রীভূত হয়ে বাই-পোলার ইকোনমি তৈরি হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের সুষম নগরায়নে পিছিয়ে পড়া রংপুর, বরিশাল, রাজশাহী অঞ্চলসমূহে বাজেট বরাদ্দ ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ আরও বাড়াবার প্রয়াস নেয়া প্রয়োজন।
মূল প্রবন্ধে সমীক্ষা প্রতিবেদনের সারাংশে বলা হয়, ২০২১-২২ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর বাজেট বরাদ্দে ‘আবাসন ও নাগরিক সুবিধাদি খাতে’ ঢাকা জেলা ৩৭ ভাগ, চট্টগ্রাম জেলা বরাদ্দ পেয়েছে ১৭ ভাগ। সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ৬টি জেলা (ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ) মোট বরাদ্দের প্রায় ৭৪ ভাগ পেয়েছে, বিপরীতে সর্বনিম্ন বরাদ্দপ্রাপ্ত ২৫টি জেলা পেয়েছে মোট বরাদ্দের প্রায় ৬ ভাগ। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম বরাদ্দ পাওয়া কয়েকটি জেলা হচ্ছে, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, বরগুনা যাদের প্রত্যেকের প্রাপ্তি শতকরা ০.২০ ভাগের মতো। এই খাতের জন্য বৈষম্য পরিমাপক পালমা রেশিও’র মান ১২.৬৩ যা উচ্চমাত্রার বৈষম্য নির্দেশ করে। উল্লেখ্য পালমা রেশিওতে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১০ ভাগের মোট প্রাপ্তির সাথে সর্বনিম্ন বরাদ্দপ্রাপ্ত ৪০ ভাগের মোট প্রাপ্তির তুলনা করা হয়।
সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১-২২ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর বাজেট বরাদ্দে যৌথভাবে ‘আবাসন ও নাগরিক সুবিধাদি’ এবং ‘স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন খাতকে বিবেচনা করা হলে জেলাভিত্তিক বরাদ্দের অসমতা কিছুটা কমে আসে। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ঢাকা জেলার প্রাপ্তি শতকরা ২২.৭২, চট্টগ্রামের ১১.৭৫, গাজীপুরের ৫.২৩, কক্সবাজারের ৩.৫১ ভাগ। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বরাদ্দপ্রাপ্ত জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম ঝালকাঠি, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, মুন্সিগঞ্জ, মেহেরপুর, নড়াইল যাদের প্রত্যেকের প্রাপ্তি শতকরা ০.৫০ ভাগ। এই ক্ষেত্রে বৈষম্য পরিমাপক পালমা রেশিওর মান ৩.৭৮। আবাসন ও নাগরিক সুবিধাদি খাতের সাথে এই মান তুলনা করলে বুঝা যায়, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তুলনামূলকভাবে অসমতা দূরীকরণের এক ধরনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা ইতিবাচক। সামগ্রিকভাবে দেশের এলাকাভিত্তিক উন্নয়নের যে বৈষম্য আছে তা কমিয়ে দেশের সুষম ও টেকসই উন্নয়ন করতে সরকারকে পিছিয়ে পড়া এলাকাসমূহের বাজেট বাড়ানোসহ আরও কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নিতে হবে বলে আইপিডির পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়।
নগর সংলাপে পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, নগরায়নের প্রকৃত সুফল পেতে হলে সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্প, উপজেলা মাস্টার প্ল্যানসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন করতে উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। প্রেক্ষিতে পরিকল্পনার লক্ষ্য অনুযায়ী নগরায়ন ও নাগরিক সুবিধাদির বিকেন্দ্রীকরণ করা ও উপজেলা পর্যায়ে জনসংখ্যার পরিকল্পিত পূনর্বিন্যাসের মাধ্যমে উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব বলে মত দেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের নগর এলাকায় টেকসই উন্নয়ন করতে ব্যক্তিস্বার্থের পরিবর্তে সামগ্রিক জনস্বার্থের বিষয় মাথায় রেখে নগর পরিকল্পনার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। শহরের সুবিধা যখন গ্রামে যাবে এবং গ্রামের সুবিধা যখন শহরে পাওয়া যাবে, তখনই ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরিকল্পনাবিদ ড. চৌধুরী মো. জাবের সাদেক সারা দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য ‘বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালা’ তৈরি এবং প্রশাসনিক ও দক্ষ মানবসম্পদের বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেন।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও অর্থনীতিক অঞ্চল তৈরি করার কারণে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে যেন পরিবেশ-প্রতিবেশের কোনো বিপর্যয় না হয়।
পরিকল্পনাবিদ মইনুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পক্ষে সকলের জন্য মানসম্মত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেশের ছোট ও মাঝারি শহরগুলোতে উন্নয়ন ছড়িয়ে দিতে পারলে বড় শহরের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
উন্নয়ন গবেষক পরিকল্পনাবিদ মো. রেদওয়ানুর রহমান বলেন, দেশের উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি নাগরিক সুবিধাদি মাঝারি আয়তনের শহরে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিভাগীয় শহর ও ১৭টি পুরাতন বৃহত্তর জেলাকে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে। অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন বৈষম্য কমাতে চীনের অনুসৃত সকল অঞ্চলকে গুরুত্ব দেয়ার কৌশল অনুসরণের পরামর্শ দেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা সারা দেশের সুষম উন্নয়ন এর লক্ষ্যে ছোট শহরগুলির পরকল্পিত উপায়ে প্রস্তুত হবার জন্য যথাযথ উদ্যোগের গ্রহণের পরামর্শ দেন।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনজুর মোর্শেদ খুলনা শহরের উদাহরণ টেনে বলেন, খুলনা শহরের আশপাশে কেন্দ্রীয় এলাকার চেয়েও বেশি গতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যাকে সঠিক ব্যবস্থাপনায় আনা প্রয়োজন।
নগর সংলাপে বক্তারা আরও বলেন, আগামী দিনের নগরায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নগর এলাকার ভারবহন ক্ষমতা, কাঙ্ক্ষিত জনঘনত্ব, পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষা, সাশ্রয়ী আবাসন ও প্রবেশগম্য নাগরিক সুবিধাদির সংস্থান করে বাংলাদেশের বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা ও পৌর এলাকার শহরসমূহের জন্য টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন উদ্যোগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারের সকল সংস্থাসমূহের মধ্যে আন্তঃসমন্বয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
]]>




