উৎসব যেভাবে শোকে পরিণত হলো
<![CDATA[
চারদিকে আর্তনাদ। আসছে একের পর এক মৃত্যুর সংবাদ। আপনজনের খোঁজে দিগ্বিদিক ছুটছেন অনেকে। পরিস্থিতি সামাল দেয়া তো পরের কথা, কী ঘটছে তা-ই বুঝে উঠতে পারছিল না প্রশাসন। ঠিক এভাবেই বিভিষিকাময় এক রাতের সাক্ষী হলো দক্ষিণ কোরিয়া। গেল শনিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে দেশটির রাজধানী সিউলে হ্যালোইন উৎসবে হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে ঘটে গেছে বহু প্রাণহানির ঘটনা। এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে ১৫৪ জনের মৃত্যুর খবর। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার মতো একটি উন্নত দেশে কীভাবে ঘটল এমন ঘটনা?
সিউলের হ্যালোইন উৎসবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা কোরিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা বাংলাদেশি নাগরিক ম্যাক্সিম চৌধুরী সময় সংবাদকে বলেন, প্রতি বছর এই অনুষ্ঠানে আমার যাওয়া হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবার গিয়ে ফিরে আসাটা ছিল মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখব, আমি কল্পনাও করতে পারিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী ম্যাক্সিম জানান, হ্যালোইন উৎসব উপলক্ষে ইথেওয়ানের সরু গলিতে হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। কম জায়গার মধ্যে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণেই এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে।
ইথেওয়ান এলাকায় এত মানুষের ভিড় থাকে কেন?
দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম প্রণবন্ত শহর রাজধানী সিউলের ইথেওয়ান। এটিকে সিউলের প্রাণকেন্দ্রও বলা যায়। পাঁচ তারকা হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বার, ক্যাসিনো, নাইট ক্লাব, বড় বড় শপিং মল-সবই রয়েছে এই এলাকায়। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের আড্ডা-গল্পের স্থানও এটি। বিদেশিদের আনাগোনাও কম নয়।
যে কারণে ইথেওয়ানের এই ট্রাজেডি
ছুটির রাত
কর্মব্যস্ত জীবন কোরীয়দের। সময়ের মূল্য দিয়ে চলা দেশটির নাগরিকরা কখনোই যেন থেমে থাকেনা। কিন্তু এবারের হ্যালোইন উৎসবে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পর স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা দেশ। কিন্তু কীভাবে ঘটল এ দুর্ঘটনা?
আরও পড়ুন: সিউলে আরও ২ জনের মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ১৫৩
এর কারণ হিসেবে অনেকে বলছেন, পুরো সপ্তাহ ধরে টানা কাজ করে শনিবার ও রোববার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে ঘুরতে বের হন প্রায় সবাই। এবারের হ্যালোইন উৎসব ছিল শনিবার রাতে। ফলে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে একরকম মহাউৎসবেই রূপ নেয় রাতটি। আর সেই মহা উৎসবই কাল হয়েছে।
নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রভাব
এমন মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে ভিন্ন কারণ থাকতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। খাজা মামুন নামে এক প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, এই স্থানে (ইথেওয়ান) শতবার গিয়েছি, অনেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। লাখ লাখ মানুষের সমাগমও দেখেছি। সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়েও হেটেছি। কিন্তু পদদলিত হয়ে এত মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে তা কখনো কল্পনা করিনি। আমার কাছে খুবই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। অতিরিক্ত ভিড় ছাড়াও, এ দুর্ঘটনার পেছনে কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রভাব আছে বলে মনে হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোও এ বিষয়টিকে একেবারে উড়িয়ে দেয়নি। পুলিশের বরাত দিয়ে অনেক সংবাদমাধ্যম বলছে, হ্যালোইন দুর্ঘটনার আগে ইথেওয়ানের আশপাশের ক্লাবগুলো থেকে মাদকযুক্ত ক্যান্ডি সরবরাহ করা হয়েছিল। উৎসবে অংশ নেয়া বেশিরভাগ মানুষই যা গ্রহণ করেছে।
সরু রাস্তা
যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটি খুবই সংকীর্ণ একটি গলির মতো। যার দুদিকে শুধু বার আর রেঁস্তোরা। সেই গলিতে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মাতে তরুণ-তরুণীরা। কিন্তু মুহূর্তেই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। একসঙ্গে এক লাখেরও বেশি মানুষ সেই গলিতে ঢুকে পড়ায়, অল্প সময়ের মধ্যে দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভিড়ের মধ্যে পেছন থেকে সামনের দিকে ধাক্কা দেয়া হয়, আর এতেই সামনে থাকা সবাই পদদলিত হয়ে একে একে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে।
গুজব
হ্যালোইন উৎসবের রাতে হঠাৎ জনপ্রিয় এক তারকা সেখানে গিয়েছে, এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন জায়গাটিতে জড়ো হতে থাকেন। তবে পুলিশ জানায়, এ ধরনের কোনো তথ্য তাদের কাছে ছিল না। এটি ছিল সম্পূর্ণ গুজব। আর এমন গুজবই এই ট্রাজেডির অন্যতম কারণ বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম দ্য কোরিয়া টাইমস।
আরও পড়ুন: সিউলে হ্যালোইন উৎসবে পদদলিত হয়ে মৃত্যু বেড়ে ১৫১
এদিকে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইথেওয়ান বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত ২৬ বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ইরানের ৫ জন, চীনের ৪ জন, রাশিয়ার ৪ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ২ জন, জাপানের ২ জন এবং ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার নাগরিক রয়েছেন একজন করে।
সিউল ট্রাজেডিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো কোরিয়াজুড়ে। এ দুর্ঘটনায় সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে কোরীয় সরকার। এই সময়ের মধ্যে সব ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। জরুরি ছাড়া সব ধরনের ইভেন্ট স্থগিতেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
২০১৪ সালে সিউলে ফেরি ডুবে যাওয়ার পর এই হ্যালোইন দুর্ঘটনাই কোরিয়ার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
]]>




