চ্যালেঞ্জ উতরে মেয়েরা যেভাবে উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন
সায়মা আহসান (ছদ্মনাম) ভালো বেতনের কর্পোরেট চাকরি করতেন। কিছুদিন পর চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন। কারণ তার মনে হয়েছে চাকরি করে মাস শেষে যে বেতন পাওয়া যায় তা দিয়ে জীবন চলে কিন্তু জীবনমানের উন্নতি করা যায় না। এ জন্য তিনি চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় আসার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে উদ্যোক্তা হওয়াই কঠিন, সেখানে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা আরও চ্যালেঞ্জিং।
সায়মা তার নিজের জমানো বেতনের টাকা ও কিছু ব্যাংক ঋণ নিয়ে অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। শুরুর কয়েক বছর আশানুরূপ সাড়া না পেলেও, একটা সময়ে ভিন্নধর্মী ডিজাইন ও প্রচারণার জন্য ধীরে ধীরে তার ব্যবসার প্রসার বাড়তে থাকে। এভাবে সায়মার মতো অনেক নারীই নানা চ্যালেঞ্জ উতরে নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশে একজন নারী ব্যবসা করতে আসলে প্রথমেই পরিবারের বাধার সম্মুখীন হোন। সেটা সামলে উঠতে না উঠতেই শুরু হয় বিনিয়োগ নিয়ে বড় রকমের সংকট। এজন্য ব্যাংক ঋণের দ্বারস্থ হতে হয় তাদের। নিজেদের চাহিদামতো ব্যাংক ঋণ পাওয়া নিয়েও রয়েছে নানা জটিলতা। ঋণ জোগাড় হলে কিংবা বিনিয়োগের বন্দোবস্ত হলেও, অনেক নারী উদ্যোক্তা বলেছেন পাইকারি বাজারে ব্যবসায়ীরা তাদের ভরসা করতে পারেন না।
তবে এতো বাধা-বিপত্তিতেও থেমে থাকেনি নারীর উদ্যোক্তা হওয়ার পথচলা। অনলাইন ব্যবসা থেকে শুরু করে অনেকেই করেছেন ব্যক্তিগত স্টোর। সেসব স্টোরে কাজ করছেন একাধিক নারী কর্মী। মালিক নারী হওয়ায় একজন নারীও যেসব সুবিধা আশা করেন তাও পাচ্ছেন কর্মীরা। নিজেরাও স্বপ্ন দেখছেন একদিন উদ্যোক্তা হওয়ার।
ঠিক এমনই দুইজন নারী উর্মিলা শুকলা ও ফারহানা হামিদ। দীর্ঘদিন ফ্যাশন হাউজ যাত্রায় ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করার পর নিজেদের মেধা ও কর্মক্ষমতাকে যোগান দিয়ে দেশীয় কাপড় ও তাঁত নিয়ে নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করেন ব্যবসার। তাদের প্রতিষ্ঠান খুঁত। বর্তমানে খুঁত বেশ শক্তভাবে বাজারে নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অবশ্যই তাদের চলার পথ মসৃণ ছিল না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাদেরও নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হয়েছে।
ব্যবসায় চলার পথ শুরুতে কতটা কঠিন ছিল এ বিষয়ে ফারহানা হামিদ সময় সংবাদকে বলেন, আমরা যখন ব্যবসা শুরু করি, তখন বেশিরভাগ মানুষই মনে করত যে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করছি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা অবশ্যই কঠিন হবে। অনেকেই ভাবত যে এটি আমাদের শখ হয়েই থেকে যাবে। দেশের প্রেক্ষাপটে ছেলেরা ব্যবসা জিনিসটা যতটা ভালো বোঝে বা পরিচালনা করতে পারে, আশেপাশের মানুষরা ভরসা করতে পারছিল না যে, ব্যবসার মতো একটি জটিল জিনিস দুইটি মেয়ে মিলে করতে পারবে।
একই কথা জানান আরেক নারী উদ্যোক্তা তাসলিমা মিজি। দেশীয় চামড়াজাত পণ্যের প্রতি আকর্ষণ থাকায় ২০১৬ সালে ‘গুটিপা’ নামে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। ব্যবসা শুরুর দিকে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তার প্রথম বাধা ছিল পরিবার থেকে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসা শুরু করা নিয়ে ছেলেরা যে ধরনের সার্পোট পেয়ে থাকেন তা আমি পাইনি। আমার পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়েছে। পরিবারের মূল বাধা হলো প্রশংসা না করা বা উৎসাহ না দেয়া।
নারীদের জন্য বাংলাদেশ কতটা ব্যবসা বান্ধব এ প্রশ্নের জবাবে ফারহানা হামিদ বলেন, আমি মনে করি, একজন নারী উদ্যোক্তা যতক্ষণ পর্যন্ত ভাববেন যে, আমি নারী তাই আমি জটিলতায় ভুগছি, ততক্ষণ পর্যন্ত সে আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগবেন। আমার ধারণা, আমাদের সমাজে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আমাদের অনেক রকম ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। শুরুর দিকে আমাদের কোনো পুরুষ কর্মচারী ছিল না। সবই মেয়ে কর্মচারী ছিল। শুরুতে ফেব্রিক কালেকশন, তাঁতিদের সঙ্গে দেখা করা, বাসে ভ্রমণ করা বা ট্রাকে করে যাতায়াত করা- এই সমস্ত বিষয়ে শুরুর দিকে আমাদের পরিবার, বন্ধুবান্ধব সকলেই এ দেশের মেয়েদের নিরাপত্তা ও সামাজিক কারণে এক ধরনের আতঙ্কে ভুগত। আমরা নিরপদ কি না, বা আমরা পারব কি না।
তিনি বলেন, আমরা যখন কোনো কাঁচামাল কিনতে যেতাম, তখন একজন পুরুষকে যতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হত, আমাদের সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হতো না। আমাদের মনে হত, একজন পুরুষ তাঁতির কোনো পণ্যের জন্য ক্রয়াদেশ দিলে যতটা গুরুত্ব দেয়া হতো, আমাদের তার চেয়ে কম গুরুত্ব দেয়া হতো। যদিও বর্তমানে ব্যবসা করতে করতে তাঁতিদের সঙ্গে আমাদের একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা সে সময় অটল ছিলাম এবং বিশ্বাস করতাম- আমরা যদি লেগে থাকি তাহলে তাঁতিরা আমাদের ওপর ভারসা করতে পারবে। এর পেছনে অবশ্য কারণ আছে। তারা বেশিরভাগ সময়েই কোনো নারী উদ্যোক্তাকে দীর্ঘদিন ব্যবসা করতে দেখেন না।
বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ নারীদের জন্য কোনোভাবেই ব্যবসাবান্ধব নয় এমন মন্তব্য করে তাসলিমা মিজি বলেন, নারীরা ব্যবসা করতে আসলে তাদের পুঁজি থাকে না, পারিবারিক উৎসাহ থাকে না, বিপণনে সমস্যা, চলাফেরার সমস্যা, আবার সামাজিক সমস্যাও থাকে- নারীদের নিরুৎসাহিত করা হয়, বাধা দেয়া হয়, নারীদের জন্য নানা ধরনের বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। সেক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের চেয়ে বেশি উদ্যমী হতে হয়। ব্যবসা তো একটি প্রতিযোগিতামূলক ব্যাপার, সেখানে নারীদের এসব বাধাগুলোর কারণে পিছিয়ে পড়তে হয়। এ জিনিসগুলো আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে। এছাড়াও ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের প্রতি মানুষের আস্থা কম। কিস্তু অনেকদিন ব্যবসা করে তা অর্জন করতে হয়েছে। তারপরও ব্যবসায়ী হিসেবে যেহেতু প্রতিনিয়ত অনেক মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়, তাই এ আস্থার জায়গায় একটু পার্থক্য থেকেই যায়।
ব্যাংক ঋণ ও এসএমই সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন ব্যাংক ঋণ ও এসএমই’র আওতায় অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সে রাস্তাটা অত সহজ ছিল না। ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। ঋণ পাওয়ার বিষয়টি আরও সহজ করতে হবে। অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধার কথাই বলা হয়। কিন্তু দিন শেষে মেয়েরা তা পায় না।
তবে ফারহানা হামিদ বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। আমাদের দেশে সরকার ও ব্যাংক নারীদের ব্যবসা করতে উৎসাহ দেয়। আমাদের এখন পর্যন্ত ঋণ নেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, কিন্তু বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা আমাদের অনেক ধরনের সুবিধা দিতে চেয়েছে। যেটা আমাদের সাহস জুগিয়েছে। আমরা যদি বিপদে পড়ি তাহলে আমরা সহায়তা পাব- এ বিশ্বাসটি ব্যাংকের প্রতি সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিযোগিতার বাজারে অনলাইনে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ক্রেতার আস্থা অর্জন করা। এ বিষয়ে ফারহানা হামিদ বলেন, শুরুতে আমাদের ব্যবসার পরিসর শুধু অনলাইন মাধ্যমেই ছিল। তখন ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। কারণ অনেকই অনলাইনে ব্যবসা করছেন এবং তা অল্প কিছু সময়ের জন্য করছেন। যখন কেউ অল্প কিছুদিনের জন্য ব্যবসা করেন, তার ব্যবসার পলিসি অন্যরকম হয়। তখন সেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা, আমাদের পণ্যের মান বা স্থায়ীত্ব- এরকম অনেক কিছু নিয়েই আমাদের ভাবতে হয়েছে। বিশ্বাস অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের পণ্যের মানের কথা ভাবতে হয়েছে- যা এখনও করতে হয়। কারণ এখন এত বেশি অনলাইন পেইজ ও ব্যবসা হচ্ছে যে আমাদেরই বাজারে টিকে থাকতে হলে প্রতিনিয়তই ভাবতে হচ্ছে। কারণ নতুন কোনো ক্রেতা যখন পণ্য কিনেন তখন তারা প্রশ্ন করেন আমাদের পণ্যের মান ঠিক থাকবে কি না।
অনলাইন ব্যবসায় একটি বড় অংশ আমদানি করা পণ্যের দখলে রয়েছে উল্লেখ করে তাসলিমা মিজি বলেন, চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের সঙ্গে আমাদের একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। চীনা পণ্যগুলো তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করা হয়, কারণ চীনে কাঁচামাল সস্তা। ওদের স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। তাদের উৎপাদনের কার্যকারিতা আমাদের থেকে অনেক বেশি। আমাদের দেশে কাঠামোগতভাবে শিল্পান্নয়ন ঘটেনি। ফলে আমাদের উৎপাদন খরচ বেশি। লেদারের পণ্যের ক্ষেত্রে আমাদের এ সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। এক্ষেত্রে ক্রেতা আকর্ষণের জন্য ব্রান্ডিং করতে হয়। আমাদের দেশে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে সে রকম ব্রান্ডিং নেই। ফলে আমাদের দেশের ক্রেতারা বাইরের দেশের আমদানি করা পণ্যের প্রতি বেশি ঝোঁকেন।
অতিমারি করোনার সময়ে সারাবিশ্বের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। যা ঠিক সামলে উঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের দরুণ বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় ভুগছে। করোনাকালীন ও করোনা পরবর্তীকালে ব্যবসার বিষয়ে ফাহমিদা হামিদ বলেন, করোনার সময়ে যোগাযোগে সমস্যা হলেও আমাদের ভালো ব্যবসা হয়েছে। কারণ মানুষ সে সময়ে ঘরবন্ধি আর আমরা যেহেতু অনলাইনেও সেবা দিয়ে থাকি সেক্ষেত্রে করোনার প্রাদুর্ভাবের সময়ে আমাদের অনলাইনে ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বরং করোনার পরে যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে, এতে করে আমাদের ব্যবসায়ে মন্দা দেখা দিচ্ছে। তবে এমন পরিস্থিতি যে দেখা দিবে সেটি আমরা শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলাম। ফলে আমরা সেটি পার করে ফেলেছি।
এদিকে তাসলিমা মিজি বলেন, করোনার সময়ে আমাদের বিশাল একটা ক্ষতি হয়েছে। সেটি সামাল দেয়ার সময় আর পেলাম না। এখন আবার সারাবিশ্বে একটি নতুন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছে। সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের সরবরাহ চেইনে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এতে করে আমরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছি।




