খেলা

ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকলে কি ইউক্রেন যুদ্ধ হতো?

<![CDATA[

কোথাও যুদ্ধ হবে কি হবে না, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে রাজনৈতিক নেতাদের মর্জির ওপর। কেউ কেউ আছেন সংঘাতপ্রিয়। আবার কৌশলে যুদ্ধ এড়িয়ে চলেন অনেকেই। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের জন্য পশ্চিমাদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে আসছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোয় যোগদানকে কেন্দ্র করেই এ যুদ্ধের সূত্রপাত।

আর এ সংঘাতে ইউক্রেনকে এগিয়ে দিতে সব ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্যও দিয়েছে ওয়াশিংটন। আর এর সবই হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেতৃত্বে। বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর তার নেয়া চীন, রাশিয়া ও ইরানবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপেরও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।

এ মুহূর্তে অনেক মার্কিনিই প্রশ্ন তুলেছেন: তবে কি তারা ভুল প্রেসিডেন্টকে নির্বাচন করেছেন? খোদ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে কখনোই বিশ্ববাসীকে ইউক্রেন-রাশিয়ার এ যুদ্ধ দেখতে হতো না।

প্রশ্ন উঠছে: ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকলে আসলেই কি এই যুদ্ধ এড়ানো যেত? এ প্রশ্নের উত্তরের পাশাপাশি ট্রাম্পের শাসনামলে তার প্রশাসনের যুদ্ধবিরোধী নানা বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এ লেখায়।

প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে থাকলে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ হতো না। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পরপরই একটি জরিপ প্রকাশ করে হার্ভার্ড সেন্টার ফর আমেরিকান পলিটিক্যাল স্টাডিজ–হ্যারিস পোল।

জরিপের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬২ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প বাইডেনের চেয়ে যোগ্য।

আর বাইডেনের জায়গায় এখন ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কখনোই ইউক্রেনে হামলা করতেন না। কারণ হিসেবে ৫৯ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের দুর্বলতার কারণেই পুতিন শুরুতেই এত আক্রমণাত্মক হামলা চালিয়েছেন।

কীভাবে যুদ্ধ এড়াতেন ট্রাম্প

যুদ্ধের পরপরই খোদ ট্রাম্পও দাবি করেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে ইউক্রেনে যুদ্ধ হতে দিতেন না। এমনকি কীভাবে এই সংঘাত এড়ানো যেত, তা-ও তুলে ধরেন নিজের ভাষণে। ট্রাম্প বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রায়ই পরমাণু যুদ্ধের হুমকি দেন। এটা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাবেক এ মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, তিনি ক্ষমতায় থাকলে একেবারে ভিন্ন কৌশলে পুতিনকে সামলাতে পারতেন। তিনি বলেন, পুতিন মূলত অন্য দেশগুলোকে ভিতসন্ত্রস্ত করে রাখতেই পরমাণু যুদ্ধের হুমকি দেন। আর দেশগুলো পুতিনের অব্যাহত হুমকিকে ভয় পায় বলেই ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করতে পেরেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। এমনটাই বিশ্বাস ট্রাম্পের।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জায়গায় থাকলে ট্রাম্প কী করতেন–এক সাক্ষাৎকারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুরুতেই পুতিনকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সামর্থ্যের বিষয়ে সতর্ক করতেন। এবং যেকোনো মূল্যে ইউক্রেনে রুশ অভিযান ঠেকাতেন তিনি।

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান 

উত্তর কোরিয়া, চীন, ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়ালেও শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়িয়ে চলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে বেশ কিছু চুক্তিও করেছেন তার শাসনামলে।

সম্প্রতি ট্রাম্প এক জনসমাবেশে দাবি করেন, চার দশকের মধ্যে তিনিই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের সঙ্গেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়ায়নি।

উত্তর কোরিয়ায় যুদ্ধ এড়িয়েছেন

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলেও বাগ্‌যুদ্ধ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত হুমকি-ধমকিও দেন ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন। তবে এই দুই নেতার সম্পর্ক বেশির ভাগই টুইট আর বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংস করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো জায়গায় আক্রমণ করার ক্ষমতা রয়েছে বলে পাল্টা সতর্কবার্তা দেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন।

কিন্তু এত কিছুর পরও ট্রাম্প কিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইতিহাস গড়েন। ট্রাম্পের শাসনামলে মোট তিনবার মুখোমুখি বৈঠকে মিলিত হয়েছেন ট্রাম্প ও কিম। ২০১৮ সালে, সিঙ্গাপুরে দুই নেতার ঐতিহাসিক বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, দুই নেতা একে অপরের প্রেমে পড়েছেন।

দ্বিতীয়বার ভিয়েতনামে সাক্ষাৎ করেন দুই নেতা। এরপর বন্ধুত্বের টানে সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিমের সঙ্গে দেখা করতে আবারও ইতিহাস গড়ে তার দেশেই সফর করেন। সিঙ্গাপুরে প্রথম দফা বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে চুক্তিও স্বাক্ষর করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ওই বৈঠকে দুই নেতা কোরিয়া উপদ্বীপকে পুরোপুরি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ করতে চুক্তি সই করেন। কিম তখন বলেন, দুই নেতা অতীতকে পেছনে ফেলে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। বিশ্ব এক বড় পরিবর্তন দেখতে পাবে বলে জানান তিনি। ওই বৈঠকে রাজি হওয়ায় ট্রাম্পকে কৃতজ্ঞতাও জানান কিম।

তবে চুক্তিটি নিয়ে কিছুটা বিতর্ক তৈরি হয়। কারণ, ওই বৈঠকের পর কীভাবে ও কখন উত্তর কোরিয়া পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ কাজ শুরু করবে, সে বিষয়ে কিছু বলা হচ্ছিল না। যদিও এরপর চুক্তি অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ শুরু করে বলেও খবর প্রকাশ হয়।

সে সময় গণমাধ্যমগুলো জানায়, পরমাণু উৎক্ষেপণ স্থাপনা ধ্বংস করতে উত্তর কোরিয়া কাজ শুরু করেছে। উত্তর কোরিয়ার সোহায়ি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের পাঠানো ছবি থেকে দেখা যায় উত্তর-পূর্বের রকেট সাইট ধ্বংস করতে শুরু করেছে দেশটি।

মহাকাশ থেকে সোহায়ির পাঠানো ছবির আলোকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণ গ্রুপ ‘৩৮ নর্থ’ জানায়, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে কিম জং উন যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সে অনুসারে কাজ করতে শুরু করেছে পিয়ংইয়ং।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পারমাণবিক শক্তিধর উত্তর কোরিয়ার মতো একটি দেশের সঙ্গেও নিশ্চিত যুদ্ধাবস্থা এড়াতে সক্ষম হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু কি তা-ই, হোয়াইট হাউস ছাড়ার পরও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগ রেখেছেন ট্রাম্প।

এমনটাই জানায় সংবাদমাধ্যম। উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে দুশ্চিন্তার মধ্যেই এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিলেন ট্রাম্প

বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে বহুমুখী প্রতিযোগিতায় ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ চীন সাগরের সীমানার অধিকার নিয়ে চীনের দাবি অবৈধ আখ্যা দেন ট্রাম্প। চীনা পণ্যের ওপর দফায় দফায় শুল্ক আরোপের জেরে বাণিজ্যযুদ্ধও শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে।

টিকটক আর উইচ্যাটের মতো জনপ্রিয় চীনা অ্যাপও যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করেন ট্রাম্প। টেলিকম জায়ান্ট হুয়াওয়েকে কালোতালিকাভুক্ত করাসহ নানা কারণে দফায় দফায় বাগ্‌যুদ্ধে লিপ্ত হয় ট্রাম্প ও শি প্রশাসন।

কিন্তু এরপরও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়িয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে বর্তমান বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। তাইওয়ান ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

আফগানিস্তানে যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের উদ্যোগ 

দীর্ঘ ২০ বছর আফগানিস্তান যুদ্ধে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা এবং আনুমানিক ২ লাখ ৪০ হাজার আফগান নাগরিককে জীবন দিতে হয়েছে। খরচ হয়েছে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধে তো জড়ায়ইনি; বরং দীর্ঘ দুই দশকের আফগানযুদ্ধ বন্ধে প্রথমবারের মতো উদ্যোগ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আফগান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কাতারে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার মাধ্যমে মূলত আফগানিস্তানের ভেতরে থাকা বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার পথ খুলে যায়। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা জানায়।

দীর্ঘসময় ধরে যুদ্ধ চলা দেশটিকে ঘিরে এমন সমঝোতায় নিয়ে আসতে পারায় দু-পক্ষই সন্তুষ্টি জানায়। যার পুরো অবদানই ট্রাম্পের। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের পথ অনুসরণ করে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। যদিও রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে পারেনি তার প্রশাসন।

আরব-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে ট্রাম্প 

আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের বৈরী সম্পর্ক কাটাতেও মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে ইসরাইলের ঐতিহাসিক চুক্তির দিনটিকে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ভোর বলে আখ্যা দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

দুই উপসাগরীয় দেশ আরব আমিরাত ও ইসরাইল নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখার চুক্তি স্বাক্ষর করে তখন। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতাতেই এ চুক্তিটি সম্পন্ন হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ গোটা বিশ্বকেই ধাক্কা দিয়েছে।

বর্তমান বাইডেন প্রশাসনই এর জন্য দায়ী বলেও মনে করেন তারা। আর এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের শাসনামলের উদাহরণ টানছেন বিশ্লেষকরা। বলেন, বাইডেনের কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও অদূরদর্শী চিন্তাভাবনার কারণেই বিশ্ব আজ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে।

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!