বাংলাদেশ

ড্রাকুলা ও ভ্যাম্পায়ার কি একই?

<![CDATA[

১৮৪৭ সালের ৮ নভেম্বর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে জন্মগ্রহণ করে একটি শিশু, নাম ব্রাম স্টোকার। যে কিনা জন্মের পর ৭ বছর পর পর্যন্ত এক অজানা রোগের কারণে বিছানায় পড়েছিল। সেসময় তার মা তাকে নানা গল্প শোনাতেন যেগুলো মূলত রূপকথা কিংবা হরর কাহিনী নিয়ে ছিল। বিশেষ করে ১৯ শতকের শুরুর দিকে মহামারি কলেরার ঘটনা। সেসময় কলেরা রোগীদের জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো। আর এ বিষয়টিই ছোট্ট স্টোকারের মনে দাগ কাটে।

গল্প শুনতে শুনতে বেড়ে উঠা স্টোকার বড় হয়ে একজন লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৮৯৭ সালে তার লেখা ‘ড্রাকুলা’ বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলে দেয়। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তার ‘ড্রাকুলা’ চরিত্রটি তৃতীয় ভ্লাডের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে এই তৃতীয় ভ্লাড? তার সঙ্গে ভ্যাম্পায়ারের কি সম্পর্ক?

ড্রাকুলা, ভ্যাম্পায়ার বা রক্তচোষা যাই বলি না কেন অদ্ভূত এই মানুষরূপীদের নিয়ে কল্পকাহিনীর শেষ নেই। যুগের পর যুগ থ্রিলার কিংবা হরর সিনেমায়ও তাদের নিয়ে বেশ মাতামাতি হয়েছে। এমনকি  হলিউডের ছবিতে তাদের হিংস্রতা, প্রেম-ভালবাসা, ডেইলি লাইফ -সবকিছুই ফুটে উঠেছে।

‘ড্রাকুলা’ কিন্তু কোনো নেতিবাচক শব্দ নয়। এমনকি এর অর্থও রক্তচোষা ছিল না। ল্যাটিন শব্দ ড্রাকো থেকে ‘ড্রাকুল’ শব্দটি এসেছে। ড্রাকো শব্দের অর্থ ড্রাগন। অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বীরত্বের জন্য রোমান সম্রাট সিগিসমন্ড দ্বিতীয় ভ্লাডকে ‘অর্ডার অব দ্য ড্রাগন’ খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। সেই দ্বিতীয় ভ্লাড ড্রাকুলের দ্বিতীয় ছেলে তৃতীয় ভ্লাড, অর্থাৎ ‘ভ্লাড দ্য ইমপেলার’ কিংবা ‘তৃতীয় ভ্লাড ড্রাকুলা’।

তৃতীয় ভ্লাড
এবার প্রশ্ন হচ্ছে ড্রাকুলা বলতে দুনিয়ায় কি কিছু আছে, নাকি সবই মিথ? যদি থাকে তাহলে পৃথিবীর প্রথম ড্রাকুলা কে? ড্রাকুলা আর ভ্যাম্পায়ার কি একই? দর্শক, এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। যেতে হবে ১৩ শতাব্দীর দিকে, রোমানিয়ার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অঞ্চল ওয়ালেকিয়ায়। সেসময় ওই অঞ্চলের শাসকেরা ‘ওয়ালেকিয়ার ভয়ভড’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই শাসকদের একজন তৃতীয় ভ্লাড।

তিনি ‘ভ্লাড দ্য ইমপেলার’ কিংবা ‘তৃতীয় ভ্লাড ড্রাকুলা’ নামেও পরিচিত। তার জন্ম ১৪৩১ খ্রিষ্টাব্দে, রোমানিয়ার ট্র্যানসেলভেনিয়া। সর্ব প্রথম ১৪৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতায় আসেন তিনি। দর্শক, সেসময় ড্রাকুলা বলতে নেগেটিভ কোনো চরিত্র না বোঝালেও তৃতীয় ভ্লাডের নেতিবাচক কর্মকান্ডের জন্য ‘ড্রাকুলা’ নামটি আজ এত বছর পরেও নেগেটিভ ভাইভ দেয় সবার মনে। আজকের দিনে ড্রাকুলা বলতে যা বোঝায় সেসময় তৃতীয় ভ্লাডের সঙ্গে ‘ড্রাকুলা’ নামটি ছাড়া আরও একটি বিষয় বেশ মিলে যায়, আর তা হলো, তার নির্মম ও স্বেচ্ছাচারী আচরণ। তার নিষ্ঠুরতার প্রমাণ ইতিহাস ও বিভিন্ন গল্প কাহিনী।

আতঙ্কের নাম তৃতীয় ভ্লাড
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মোট তিনবার ক্ষমতায় এসেছিলেন তৃতীয় ভ্লাড। শত্রুদের কাছে ছিলেন নৃশংস। এ জন্য সেসময় ইউরোপে তার কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় ভ্লাডকে নিয়ে নানা কল্পকাহিনীও প্রচলিত আছে। তিনি নাকি নিজ হাতে বন্দীদের মাথা কেটে ফেলতেন। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ, তিনি নাকি শত্রুর রক্তে রুটি ভিজিয়ে খেতেন! আরেক গল্পে বলা হয়েছে, তিনি নৈশভোজের আগে শত্রুর রক্ত দিয়ে হাত ধুয়ে নিতেন।

তৃতীয় ভ্লাডকে নিয়ে এসব রোমহর্ষ কাহিনি ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু তিনি যে ক্ষমাহীন ছিলেন, সে বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই। বলা হয়ে থাকে, প্রায় ৮০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন তৃতীয় ভ্লাড। আর এর মধ্যে শূলে চড়িয়েই মেরেছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষকে। তবে তৃতীয় ভ্লাড যেমন কুখ্যাত ছিলেন, পাশাপাশি অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য লোককথার নায়কও ছিলেন তিনি।

ড্রাকুলা ও ভ্যাম্পায়ারের মধ্যে পার্থক্য
ড্রাকুলা ও ভ্যাম্পায়ার বলতে অনেকে হয়তো একই মনে করেন। কিন্তু তা নয়। পরিষ্কার ভাষায় তাদের মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে, ড্রাকুলা মূলত ব্রাম স্টোকারের একটি ফিকশনাল ক্যারেক্টার। অন্যদিকে, ভ্যাম্পায়ার বলতে রক্তচোষা বা ব্লাড সাকিং ক্রিয়েচার বোঝায়।

কিভাবে ড্রাকুলা থেকে ভ্যাম্পায়ারের সৃষ্টি হয়?
ভিক্টোরিয়ান যুগে বিভিন্ন কার্মকান্ড ও সাজসজ্জার কারণে ড্রাকুলা চরিত্রটি সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে যায়। এর উদাহরণ হলো, উপন্যাস ‘দ্য মিস্টিরিয়াস স্ট্রেঞ্জার’। তবে পরবর্তীতে কপিরাইট ইস্যুর কারণে সেসময় ড্রাকুলার চরিত্রটির ভাগ্য অলমোস্ট পুরোপুরি বদলে যায়। ১৯২২ সালে একটি জার্মান স্টুডিও এই উপন্যাসটিকে ‘নসফেরাটু’ নামে একটি নির্বাক চলচ্চিত্রে রূপ দেন। এতে অসংখ্য প্লট, কাহিনী ও চরিত্র পরিবর্তন করার কারণে অবশ্য চড়া মাশুল দিতে হয়েছিল স্টুডিওটিকে।

আরও পড়ুন: ক্রাইম থ্রিলার দেখে প্রেমিকাকে ৩৫ টুকরো?

ভবিষ্যতে ড্রাকুলা নিয়ে যেন আর কোনো প্ল্যাজিয়ারিজম ইস্যু না হয় সেজন্য ব্রাম স্টোকারের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী একটি কপিরাইট ক্লেইম করেন। সেসময় তিনি ‘ব্রডওয়ে’ নামে একটি মঞ্চ পরিবেশনায় ড্রাকুলার নতুন অ্যাডাপ্টেশনের সম্মতি দেন, যেখানে অভিনয় করেন বেলা লুগোসি।

আরও পড়ুন: যৌনকর্মী থেকে জলদস্যুর সর্দার ‘ঝেং শি’র সাহসী গল্প

‘ব্রডওয়ে’র পর বড় পর্দায় অভিনয় করে বেলা লুগোসি ক্ল্যাসিক ড্রাকুলার সঙ্গে দশর্কদের পরিচয় করিয়ে দেন। ড্রাকুলা ও ভ্যাম্পায়ার এক না আগেই বলেছি। কিন্তু বেলা লুগোসি তার অভিনয়ের মাধ্যমে পৃথিবীতে এমন এক ড্রাকুলার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন যা মৃত্যুর পরেও বার বার ফিরে আসে। আর এই ড্রাকুলাকেই হয়তো কালের বিবর্তনে আজকে আপনারা ভ্যাম্পায়ার বলে ডাকছেন।

সূত্র: COLLIDER

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!