তেলের দামের সংবাদ করায় পত্রিকা বন্ধ
<![CDATA[
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নিবন্ধ লেখায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দেশটির প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা আল রোয়েয়া। সেই সঙ্গে চাকরিচ্যুত হয়েছেন অধিকাংশ সাংবাদিক। খবর এপি।
সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, গত ২১ জুন পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হলেও মালিকপক্ষ চাকরিচ্যুত সংবাদকর্মীদের এ ব্যাপারে মুখ না খুলতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছিল। এ কারণে এতদিন পর্যন্ত জনসমক্ষে আসেনি এ ঘটনা।
জানা যায়, পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার সময় প্রায় ৫০ জন সংবাদকর্মী চাকিরচ্যুত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একদিনেই ছাঁটাই নোটিশ পেয়েছেন অন্তত ৩৫ জন সংবাদকর্মী।
আরবি ‘আল রোয়েয়া’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘দৃষ্টি’। রাজধানী আবুধাবিভিত্তিক বিনিয়োগ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ইনভেস্টমেন্ট (আইএমআই) ২০১২ সালে জাতীয় এই দৈনিকটি বাজারে আনে। এই আইএমআইয়ের স্বত্ত্বাধিকারী হলেন শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ছোটোভাই শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের একজন। আমিরাত ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আর্থিক বিনিয়োগ রয়েছে তার। আরবি দৈনিক আল রোয়েয়া ছাড়াও আমিরাতভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক দ্য ন্যাশনাল নামে একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রকাশক আইএমআই। একাধিক সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি ব্রিটিশ ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিরও মালিক শেখ মনসুর।
সম্প্রতি আল রোয়েয়ার কয়েকজন চাকরিচ্যুত কর্মী মার্কিন বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণকারী ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা ফ্রিডম হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপরই খবরটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আল রোয়েয়ার চাকরিচ্যুত কর্মীদের একটি অংশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এপি। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে মার্কিন এই সংবাদ সংস্থা। সরকার প্রতিশোধমূলক নীতি নিতে পারে এই ভয়ে তথ্য প্রদানকারী সব কর্মীই তাদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন এপিকে।
আরও পড়ুন: সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসছে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স
এপির খবরে জানা যায়, টানা দুই বছর করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে চলতি বছর ক্রমশ বাড়ছিল জ্বালানি তেলের দাম। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ বিভিন্ন দেশ জ্বালানি তেলে ভর্তুকির হার বাড়ালেও আন্তর্জাতিক বাজারে অধিক মুনাফার আশায় আমিরাত তেলের ওপর ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নেয়।
ফলে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের চেয়ে আমিরাতে তেলের মূল্য ছিল বেশি। এই দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় চলতি বছরের মে-জুন মাসের দিকে। অতিরিক্ত মূল্যের কারণে ব্যাপক ভোগান্তির মধ্যে পড়েন আমিরাতের সাধারণ জনগণ।
দেশের এমন পরিস্থিতিতে এ বছরের জুন মাসে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে আল রোয়েয়া। সেই নিবন্ধের মূল বিষয়বস্তু ছিল তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমিরাতের মানুষজনের ভোগান্তি। স্বাভাবিকভাবেই ভোগান্তির শিকার বহু মানুষের বক্তব্য সংযুক্ত করা হয়েছিল নিবন্ধটিতে।
সাক্ষাৎকার দেওয়া এসব লোকজনের মধ্যে কয়েকজন ট্যাক্সিচালকও ছিলেন। তারা আল রোয়েয়াকে জানিয়েছিলেন, দেশে দাম চড়া থাকায় তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ওমানে গিয়ে পেট্রোল কেনেন। আমিরাতের তুলনায় ওমানে পেট্রোলের দাম অর্ধেক।
নিবন্ধটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি আল রোয়েয়ার ওয়েবাসাইট থেকে মুছে ফেলা এবং সেটি যেন কোনোভাবেই প্রিন্টেড কপি আকারে না আসে, সে ব্যবস্থা নিতে আল রোয়েয়া সম্পাদককে নির্দেশ দেয় আইএমআই কর্তৃপক্ষ।
আরও পড়ুন: ধূলিঝড়ের কবলে সংযুক্ত আরব আমিরাত
চাকরিচ্যুত এক সংবাদকর্মী এপিকে বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে গণমাধ্যম আইন কঠোর। আমরা ভেবেছিলাম, যেহেতু আল রোয়েয়ার মালিক প্রেসিডেন্টের আপন ছোটো ভাই। ফলে এই নিবন্ধটি প্রকাশ করলে সমস্যা হবে না। কিন্তু আমাদের ধারণা ভুল ছিল।
নিবন্ধটি প্রকাশের এক সপ্তাহ পর আইএমআই শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নার্ত বৌরান আল রোয়েয়া কার্যালয়ে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি ঘোষণা দেন, এখন থেকে আল রোয়েয়া নামে আর কোনো সংবাদমাধ্যম থাকবে না।
তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই সিএনএনের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নতুন একটি আরবি সংবাদমাধ্যম খুলতে যাচ্ছে আইএমআই।
ওই দিনই নিবন্ধটি লেখা ও প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মীদেরসহ অন্তত ৩৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তার পরের কয়েকদিনে ছাঁটাই করা হয় আরও ১৫ জনকে।
আল রোয়েয়া কার্যালয়ে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে নার্ত বৌরানের বৈঠকের পরই পত্রিকাটির প্রিন্টেড সংস্করণ প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর ২১ জুন বন্ধ করে দেওয়া হয় আল রোয়েয়ার অনলাইন সাইটটিও।
এ সম্পর্কে মন্তব্য জানতে আইএমআই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এপি। প্রতিষ্ঠানটির এক জেষ্ঠ্য কর্মকর্তা এপিকে বলেন, আল রোয়েয়া বন্ধের সিদ্ধান্তটি দুর্ভাগ্যজনক হলেও প্রয়োজনীয় ছিল।
]]>




