দুদক কর্মকর্তা শরীফ এখন দোকানের ক্যাশিয়ার
<![CDATA[
চট্টগ্রাম ষোলশহর স্টেশনের পাশে একটি মিনি স্টলের ক্যাশবাক্সের সামনে বসে আছেন এক পরিচিত মুখ। ক্রেতাদের থেকে বিল নিচ্ছেন,পাওনা টাকা ফেরত দিচ্ছেন। সহজ ভঙ্গিতে বসে থাকা ক্যাশিয়ার অনেকের কাছে একসময়ের পরিচিত মুখ শরীফ উদ্দীন। এক বছর আগেও তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তা ছিলেন। ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে চাকরি হারিয়েছেন বলে অভিযোগ তার।
বর্তমানে বড় ভাইয়ের দোকানে ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। চাকরি হারানোর পর নয় মাস বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের চেষ্টা করেছিলেন। কোথাও চাকরি পাননি বলে জানান শরীফ। সংসার খরচ চালাতে বাধ্য হয়ে বড় ভাইয়ের দোকানে কাজ করছেন তিনি।
রোববার (৬ নভেম্বর) সকালে ষোলশহর স্টেশনের দোকানে তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে দেখা যায়, দুদকের এ কর্মকর্তা দোকানের ক্যাশ সামলাতে ব্যস্ত। আশপাশের দোকানদার বা সাধারণ মানুষ জানতেন না তিনি এক বছর আগেও দুদকের কর্মকর্তা ছিলেন। রোহিঙ্গা এনআইডি জালিয়াতি, কক্সবাজারের বড় প্রকল্পে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন জালিয়াতির ঘটনার তদন্ত করেছিলেন তিনি। অনেকের বিরুদ্ধে মামলার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছিল। তবে এসব রাঘববোয়ালের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে দুদকের চাকরি হারাতে হয়েছে বলে জানান শরীফ।
দোকানের কাজের এক ফাঁকে সময় সংবাদের সঙ্গে কথোপকথনে শরীফ উদ্দীন জানান, ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর দুদকে যোগদান করেন তিনি। এরপর উপসহকারী পরিচালক হিসেবে প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত কার্যালয়ে যোগদান করেন।
শরীফ বলেন, ‘চাকরি হারানোর নয় মাসে জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হলো মানুষ চেনা। চাকরির জন্য অনেক জায়গায় গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। সরকারি-বেসরকারি অনেক দফতরে সিভি জমা দিয়েছি। আমার বয়স এখনও খুব বেশি নয়। ছাব্বিশ বছর বয়সে চাকরিজীবন শুরু করেছি। দুদকের চাকরির বয়স আট বছর। ২০১৮ সালে প্রথম চট্টগ্রামে জয়েন করি। চট্টগ্রাম-২-এ কাজ করেছি তিন বছরের একটু বেশি। এর মধ্যে দেড় বছর কোভিডে চলে গেছে। আমার কাছে ছিল ১৩০টি বিগ ভলিউমের গুরুত্বপূর্ণ নথি। বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত রোহিঙ্গা কেলেঙ্কারির ঘটনা,পেট্রোবাংলা, ল্যান্ড একুইজিশনের সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার তদন্ত, যা বাংলাদেশের বড় তদন্তগুলোর একটি। সে সময় এনআইডি সার্ভার ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রদান ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ ঘটনায় ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশনের একজন পরিচালক ও ছয় কর্মীসহ আরও ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এ তদন্তের কাজ চট্টগ্রাম-২ থেকে আমিই করতাম।’
আরও পড়ুন: ডাল গবেষণা কেন্দ্র প্রকল্পের কোটি টাকা আত্মসাৎ: দুদকের অভিযান
শরীফ আরও বলেন, ‘সকল নথি আমাকে ঢাকা থেকেই দেয়া হয়েছিল তদন্ত করতে। তিন বছরে কোভিডকালীন কোনো ছুটিও নিইনি। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাই, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোহিঙ্গারা কোন দালালের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাচ্ছে, পাসপোর্ট পেয়ে বিদেশ যাচ্ছে–এ চক্রটাকে ধরার জন্য আমি ও আমার টিম কাজ করেছি। বিশটা মামলা করেছিলাম। এর মধ্যে এগারোটা মামলার বাদী আমি। সাতজনকে গ্রেফতার করেছি। তখন কেবল কক্সবাজারের সিন্ডিকেটকে ধরছি। টেকনাফ, বান্দরবান, কক্সবাজার, মানিকগঞ্জ থেকে শুরু করে সারা দেশে রোহিঙ্গাদের যে বড় চক্র–এগুলোর মামলার কার্যক্রম কিন্তু এখন বন্ধ।’
শরীফ বলেন, ‘আমার মোটা দাগে দুটি অপরাধ। এক নম্বর অপরাধ, পাসপোর্ট ও এনআইডি সিন্ডিকেটের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে কাজ করেছি। দুই নম্বর অপরাধ, জ্বালানি ক্রাইসিস নিয়ে কাজ করেছি। কাজের বিনিময়ে আমি ও আমার পরিবার হুমকি পেয়েছি। হুমকির ১৬ দিনের মাথায় আমার চাকরি চলে গেছে। সবকিছুই কমিশনকে জানানো হয়েছিল। কমিশন কী করেছে, তা আপনারা সবাই জানেন।’
‘আমি যদি কোনো ভুল করতাম, আমার কাজ যদি বিধিবদ্ধভাবে না হতো, আমার তো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। তারা আমাকে অবশ্যই বলতেন। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ১৬০ কিলোমিটার। দিনের পর দিন গাড়ি, লজিস্টিক সাপোর্ট তো অফিস থেকে দিয়েছে। কমিশন তো আমার কাজের জন্য ধন্যবাদ দিয়েছে। এখন সবার কাছে আমি বিরাগভাজন হলাম কী করে?’ প্রশ্ন শরীফের।
‘এ ঘটনায় আমি হাইকোর্টে যে মামলা করেছি তা বিচারাধীন। যে রায় আসবে সেটা আমি মাথা পেতে নেব।’
চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় আছেন বলে জানান শরীফ।
]]>




