নতুন বছরে কতটা ভুগবে বিশ্ব অর্থনীতি
<![CDATA[
বিশ্বব্যাপী খাদ্য, পরিবহন, জ্বালানি এবং বাসস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মূল্যস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে দেখা যায়নি। এই মূল্যস্ফীতি ক্রমেই বাড়তে থাকায় বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, নতুন বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে এর প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছালো কীভাবে? এর সহজ উত্তর- করোনা মহামারি এবং তারপরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।
স্বল্প মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন সুদহারের একটি দীর্ঘ এবং আরামদায়ক সময় হঠাৎই সংকুচিত হয়ে যায় করোনা মহামারির অভিঘাতের পর। কারণ, সে সময় বিভিন্ন দেশের সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ট্রিলিয়ন ডলার প্রণোদনা দিয়ে লকডাউনের কবলে পড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রেখেছে।
সেই সহায়তা বহু কর্মীর বেকার হওয়া, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বাড়ির দাম পড়ে যাওয়া ঠেকিয়েছে। তবে এর মধ্যেও সরবরাহ এবং চাহিদার ঘাটতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা আগে কখনও হয়নি। ২০২১ সালের শেষ দিকে এসে ধীরে ধীরে লকডাউন বা বিধিনিষেধ উঠতে শুরু করলেও, ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত মন্দা পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি।
ফলে চাহিদা মেটাতে দ্রুত কাজ করতে ব্যর্থ হয় করোনাকালে প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকা কারখানাগুলো। এছাড়া করোনা-পরবর্তী সময়ে দেখা দেয় শ্রমিক সংকট; পরিবহন এবং স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ব্যয় বেড়ে যায় জ্বলানি খাতেও।
সংকট সেখানেই থামেনি। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার সময় গেল ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আক্রমণ করে বসে রাশিয়া। এর জেরে প্রধান তেল ও গ্যাস রফতানিকারক দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে পশ্চিমারা। যার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
মুদ্রাস্ফীতি কিংবা মূল্যস্ফীতি
দ্বি-সংখ্যার মুদ্রাস্ফীতি বিশ্বব্যাপী বৈষম্যকে বাড়িয়ে তুলেছে। মুদ্রাস্ফীতি কিংবা মূল্যস্ফীতি ‘দরিদ্রদের ওপর কর’ হিসেবে পরিচিত, কারণ এটি নিম্ন আয়ের মানুষদেরই সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। মহামারি, লকডাউন কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ধনীরা তাদের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করতে পারলেও; সেই সৌভাগ্য হয় না বেশিরভাগেরই। সংকটের সময় প্রয়োজন মেটাতে কেউ নামেন জীবনযুদ্ধে, কারও কারও একমাত্র ভরসা অন্যের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা।
আরও পড়ুন: দেশে ৪ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কমছে: পরিকল্পনামন্ত্রী
বিশ্লেষকদের শঙ্কা, উত্তর গোলার্ধে শীত জেঁকে বসার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাবে। আর এর চাপ পড়বে জীবনযাত্রার খরচের ওপর। কিন্তু ব্যয় বাড়লেও সেই তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বিভিন্ন খাতের শ্রমিকরা এরই মধ্যে ধর্মঘট শুরু করেছেন। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের কম খরচে ‘বন্দোবস্ত’ করতে হচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রভাব ফেলছে ধনী দেশগুলোর রাজনীতিতেও। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম কিছুটা কমায় স্বস্তি ফিরলেও বাইডেন প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ এখন মূল্যস্ফীতি। এছাড়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলজ তাদের বাজেট প্রসারিত করছেন।
এর থেকে স্পষ্ট যে শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলোই যখন এত ভুগছে, তখন মূল্যস্ফীতির কারণে হাইতি থেকে সুদান এবং লেবানন থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত দরিদ্র দেশগুলোতে দারিদ্র্য ও দুর্ভোগ কতটা ভয়াবহ।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) অনুমান, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী অতিরিক্ত সাত কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন বা এমন পরিস্থিতির কাছাকাছি পৌঁছেছে। সংস্থাটি এই পরিস্থিতিকে ‘ক্ষুধার সুনামি’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
২০২৩ সালে কী হবে?
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো চাহিদা কমাতে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আশা, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ৪.৭ শতাংশে নেমে আসবে, যা বর্তমান স্তরের অর্ধেকেরও কম।
বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল লক্ষ্য হলো আবাসন ব্যবসায় ধস ও ব্যবসায়িক দেউলিয়াত্ব এড়িয়ে বেকারত্ব বৃদ্ধি ছাড়াই সহজে সংকট সমাধান করা। ব্যবসার ভাষায় অনেকে এটিকে বলছেন, ‘সফট ল্যান্ডিং’।
তবে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান জেরোম পাওয়েল থেকে শুরু করে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের ক্রিস্টিন লাগার্ড পর্যন্ত অনেকেই বলছেন, সুদহার বাড়িয়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা হিতে বিপরীতও হতে পারে। তার ওপরে বড় অনিশ্চয়তা আছে ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন ও পশ্চিমাদের মধ্যকার উত্তেজনা নিয়েও।
সবশেষে আইএমএফের সতর্কবার্তাও শঙ্কা বাড়িয়েছে। সংস্থাটির অক্টোবরের পূর্ভাবাসে বলা হয়েছে, ‘সবচেয়ে খারাপ সময় এখনও আসতে বাকি। ২০২৩ সালে অনেকেই মন্দা পরিস্থিতি অনুভব করবে।’
]]>




