পরিবেশ-প্রকৃতি হুমকিতে ফেলছে ইউরোপ
<![CDATA[
তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির পরিমাণ বাড়িয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। আর অতিরিক্ত গ্যাস আমদানির কারণে নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে কার্বন নির্গমন। ফলে চরম হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও প্রকৃতি।
শুধু তাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন এক গবেষণা রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ইউক্রেন সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ইউরোপের দেশগুলোকে অপেক্ষাকৃত দূরের দেশগুলো থেকে গ্যাস আনতে হচ্ছে। আবার সংকটের শঙ্কায় গ্যাস আমদানি আগের চেয়ে বাড়িয়েছে দেশগুলো।
বিবিসির চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চাহিদার কারণে তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ও পরিবহন বৃদ্ধির কারণে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি কার্বন নিঃসরণ ঘটছে। আর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবিলায় নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে চলতি সপ্তাহেই (৬ নভেম্বর থেকে শুরু) মিশরে বসতে যাচ্ছে জলবায়ুবিষয়ক কপ-২৭ শীর্ষ সম্মেলন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি কয়েক হাজার কর্মকর্তা, গবেষক ও আন্দোলনকর্মী এ সম্মেলনে সমবেত হচ্ছেন।
আরও পড়ুন: ইউরোপের ক্রমবর্ধমান গ্যাসতৃষ্ণা, অন্ধকারে বাংলাদেশ-পাকিস্তান
কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ ও যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব হিসেবে নজিরবিহীন কার্বন নিঃসরণ জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে অতিরিক্ত তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি নিয়েও বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
একদিন পরই জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক ২৭তম বৈশ্বিক সম্মেলন তথা কপ-২৭ বসছে অবকাশযাপন ও উৎসব আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শারম আল শেখে। জলবায়ু ইস্যুতে আন্দোলনকর্মী তথা বিশ্ববাসীর ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে এ নিয়ে। জাতিসংঘ গত সপ্তাহে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, নিঃসরণ হ্রাস করতে বৈশ্বিক প্রচেষ্টা ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে অপর্যাপ্ত’। এর অর্থ হচ্ছে, বিশ্ব এখন ‘বিপর্যয়ের মুখে’ রয়েছে।
কপ-২৭ সম্মেলন সামনে রেখে আয়োজক দেশ মিশর কঠিন লক্ষ্য স্থির করেছে। এর আগে গত বছর যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে কপ-২৬ সম্মেলনে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, জলবায়ু কর্মসূচিতে অর্থায়ন, বন সুরক্ষাসহ অন্যান্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করা হয়েছিল। মিসর বলছে, এবারের সম্মেলন হবে সেসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে।
কপ-২৭ সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষোভকে অবমূল্যায়ন করবেন না। ’ মহাসচিব আরও বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো মনে করে, উচ্চআয়ের দেশগুলো ২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিস সম্মেলনে সম্পাদিত যুগান্তকারী জলবায়ু চুক্তিটি বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়।
আরও পড়ুন: ইউরোপে ফুরিয়ে আসছে গ্যাসের মজুত
প্যারিস চুক্তিতেই সর্বপ্রথম উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষতির কথা গৃহীত হয়। নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমেই যে এর সমাধান করা সম্ভব, তারও স্বীকৃতি দেয়া হয়। ধনী দেশগুলো তখন ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে সম্মত হয়েছিল।
উন্নত দেশগুলোর সহায়তার প্রতিশ্রুতিটিই এবারের কপ সম্মেলনের কার্যতালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। ২০০৯ সালে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি প্রশমনে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উন্নত বিশ্ব প্রতিবছর ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেবে। ২০২০ সালের মধ্যে ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো অদৃশ্য কারণে তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
চলতি বছর নজিরবিহীন বন্যা ও দাবদাহের কবলে পড়েছে পাকিস্তান। বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনই এর কারণ। এর সুবাদে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত ১৩৪টি উন্নয়নশীল দেশের জোটের সভাপতি দেশ হিসেবে পাকিস্তান ক্ষতিপূরণের বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে।
যুদ্ধে উন্নত বিশ্ব কত অর্থ ব্যয় করছে, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি প্রসঙ্গে পাকিস্তানের জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী শেরি রেহমান বলেন, ‘আমি মনে করি না যে এটি কোনো অসম্ভব চাওয়া।’
আরও পড়ুন: তুরস্কের মধ্যদিয়ে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব পুতিনের
জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজক মিসর সতর্ক করে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পেলে সম্মেলনকে ঘিরে ‘আস্থার সংকট’ তৈরি হবে। নিরাশ হয়ে এবারের সম্মেলনে যাচ্ছেন না সুইডেনের প্রভাবশালী জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব এবারের সম্মেলনকে উন্নত বিশ্বের জন্য ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্ব জলবায়ু ইস্যুতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করলেও নগদ সহায়তার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছুই জানায়নি। আগামী বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় ক্ষতিপূরণ নিয়ে উন্নত বিশ্ব চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া ইউক্রেনে রুশ সামরিক আগ্রাসনের জেরে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা সমস্যা দেখা দেওয়ায় উন্নত দেশগুলো নিজ নিজ অর্থনীতির দিকেই বেশি দৃষ্টি দিচ্ছে। শীর্ষ দুই দূষণকারী যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় দেশের ভূমিকা সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ হবে, যা আগেও ছিল।
]]>




