বিনোদন

পুস্তক মুদ্রণে এনসিটিবির স্থায়ী অদক্ষতা

<![CDATA[

গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) আওতাধীন পুস্তক মুদ্রণ কার্যক্রম নানাবিধ জটিলতার মধ্যে নিপতিত হয়েছে এবং মুদ্রিত পাঠ্যপুস্তক যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ খবর শুনে অবশ্য কেউই বিস্মিত হননি। বরং এ বছরের এ কার্যক্রম যদি কোনোরূপ অনিয়ম, দুর্নীতি ও জটিলতা ছাড়াই সম্পন্ন হতো, তাহলে সেটিই হতো অধিকতর বিস্ময়ের ব্যাপার। কারণ এনসিটিবি যখন থেকে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণের কাজ শুরু করেছে, তখন থেকে অদ্যাবধি কখনো তা অনিয়ম ও দুর্নীতি ছাড়া সম্পন্ন হয়েছে-এমন দৃষ্টান্ত নেই। বরং ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতি ও অনিয়মে যুক্ত থাকা এবং কোনোরূপ জবাবদিহিতা ও শাস্তির মুখে পড়তে না হওয়ার ক্ষেত্রে নজির সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় এনসিটিবি একেবারে প্রথম সারিতে থাকবে বলেই ধারণা করা চলে।

এনসিটিবির দুর্নীতি, অনিয়ম ও অদক্ষতা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময়ে বহু লেখালেখি ও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সেসবের কোনোটিরই কোনো প্রতিকার হয়নি এবং এসব অনিয়ম, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে এনসিটিবির কাউকে কখনো কোনোরূপ শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি বা এ জন্য কাউকে কোনোরূপ জবাবদিহিও করতে হয়নি। এ যেন অনেকটা বেসিক ব্যাংকের এককালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও ঢাকা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের মতো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর এবং খোদ তৎকালীন অর্থমন্ত্রীও শত চেষ্টা করে আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে কোনোরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেননি। একইভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধেও। অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তাদের অবস্থান অনেকটাই যে কারো ধরাছোঁয়ার বাইরে। একইভাবে অদৃশ্য শক্তির সংশ্লিষ্টতার কারণে বছরের পর বছর ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।

উল্লিখিত পরিস্থিতিতে এ নিয়ে লিখে সহসা তেমন কোনো ফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু তারপরও এ নিয়ে লিখতে হবে এ কারণে যে, তাদের এসব অন্যায় কর্মের ফল ভোগ করতে বা খেসারত দিতে হচ্ছে এ দেশের লাখ লাখ কোমলমতি শিশু-কিশোরকে। এখানে শিশু-কিশোরদের উপর এ ক্ষতির প্রভাব দ্বিবিধ।

প্রথমতঃ যথাসময়ে বই না পেলে তাদের পড়াশোনা বিঘ্নিত হবে। আর সে বই নিম্নমানের কাগজে যেনতেনভাবে ছাপা হলে এর একটি নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তাদের উপর পড়বে বৈকি! অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রভাবটি হচ্ছে, শিশু-কিশোররা যখন জানতে পারবে যে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা, অযোগ্যতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই বস্তুত বই পেতে বিলম্ব হচ্ছে, তখন অবচেতনভাবে নিজ রাষ্ট্র সম্পর্কে তার মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে, পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে তার মধ্যে এর রেশ থেকে যেতে বাধ্য। কিন্তু ছোট ছোট অথচ অত্যন্ত সুক্ষ ও সুদুরপ্রসারী এই মনস্তাত্ত্বিক অনুষঙ্গগুলো নিয়ে আমাদের শিক্ষা-কর্তৃপক্ষ কি কখনো ভেবে দেখেছেন?

আরও পড়ুন: বই উৎসবে পুরো সেট পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা

পত্রিকার খবরে প্রকাশ, এ বছরের পুস্তক মুদ্রণের ক্ষেত্রে কার্যাদেশ প্রদানে বিলম্ব ঘটেছে এবং কিছু কিছু কার্যাদেশ প্রদানের কাজ এখনও বাকি আছে। এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ বলবেন কি কার্যাদেশ প্রদানে কেন বিলম্ব ঘটলো বা ঘটছে? জবাব না শুনেই বলা যায়, তারা এমন কোনো যুক্তি অবশ্যই দেখাতে সক্ষম হবেন যা শুনে প্রশ্ন করার জন্য নিজেকেই অপরাধী মনে হবে। অর্থাৎ যথাসময়ে কার্যাদেশ দিতে না পারার পক্ষে কোনো না কোনো যুক্তি তারা অবশ্যই দেখাতে সক্ষম হবেন, যে সক্ষমতা তারা প্রতিবছরই এবং নিয়মিতভাবেই দেখাতে সক্ষম হয়ে থাকেন। কিন্তু কী করলে সময়মতো কার্যাদেশ প্রদান, ভালো কাগজে ও ন্যূনতম মূল্যে মানসম্পন্ন মুদ্রণ নিশ্চিতকরণ, মুদ্রিত পুস্তকের সরবরাহ সময়মতো প্রাপ্তি ইত্যাদি কাজগুলো নিশ্চিত করা যাবে, তা তারা প্রায় কখনোই ভেবে দেখেন না এবং এই ভেবে না দেখার জন্য তাদেরকে কোনোরূপ জবাবদিহিও করতে হয় না।

এদিকে পুস্তক মুদ্রণকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ মুদ্রণ সমিতি জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জন্য মুদ্রিতব্য পুস্তকের ৯০ শতাংশ কাজই এখনো বাকি আছে এবং আগামী পয়লা জানুয়ারির মধ্যে ৩৫ শতাংশের বেশি পুস্তক সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ এনসিটিবির চরম অদক্ষতা ও অযোগ্যতার খেসারত দেয়ার জন্য শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অন্যান্যদের মিলে এখন থেকেই মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। প্রসঙ্গত জিজ্ঞেস করি, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উদযাপনের পর্যালোচনায় এনসিটিবিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা ও অযোগ্যতা বাড়তে বাড়তে অধঃপতনের চরমে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি কী ছিল? বর্তমান আলোচনা যেহেতু শিক্ষাখাত সংশ্লিষ্ট, তাই আপাতত এখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কেই বলি, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে গত পঞ্চাশ বছরে ভবন, উপকরণ, জনবল, বরাদ্দ ইত্যাদি সবই বেড়েছে; অর্থাৎ বাহ্যিক জৌলুসে এগুলো রমরমা হয়েছে। কিন্তু গুণগত মান বাড়েনি প্রায় কোনোটিরই। অধিদফতর, বোর্ড, ইনস্টিটিউট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়), একাডেমি, কমিশন সর্বত্রই একটি খাই খাই অবস্থা। সত্যি কথা বলতে কী, আষ্টেপৃষ্টে দুর্নীতি ও অদক্ষতায় ছাওয়া এ প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে চোখ তুলে যেন তাকানোই যায় না! লজ্জায় ও অপমানে মাথা নত হয়ে আসে। আত্মধিক্কারে প্রশ্ন জাগে, এ রকম একটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই কি আমাদের মহান শিক্ষক ও অন্যান্যরা ১৯৭১-এ তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? এ রকম একটি ব্যবস্থার ব্যয় মেটানোর জন্যই কি এ দেশের খেটেখাওয়া দুঃখী মানুষ, যাদের ৪৩ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, দিনান্ত পরিশ্রম করে করের অর্থ যোগায়?

 

তো উপরোক্ত তথ্য থেকে ইতোমধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, ২০২৩ সালের পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীরা সময়মতো পাচ্ছেন না। কিন্তু ২০২৪ সালে বা তার পরের বছরগুলোতে কি তা পাওয়া যাবে? হলফ করে বলতে পারি, বর্তমানের জবাবদিহিতাবিহীন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষের প্রশ্রয় ও নমনীয়তা এবং অতীত কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা ও মূল্যায়নহীনতার ধারা বহাল থাকলে পরবর্তী বছরগুলোতেও তা পাওয়া যাবে না। বরং যথাসময়ে ও মানসম্পন্ন কাগজে পুস্তক মুদ্রণ না হওয়া, মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় বড় পরিসরের দুর্নীতি যুক্ত থাকা, শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই না পৌঁছা ইত্যাদি ঘটনাগুলো আরো অধিক দাপটের সাথে ও নির্লজ্জ ভঙ্গিতে ঘটতেই থাকবে।

 

তাহলে এ অবস্থা থেকে বেরুবার উপায় কি? বেরুবার একটিই উপায় এবং তা হচ্ছে, স্বচ্ছতাপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দক্ষতা ও জবাবদিহিতাপূর্ণ আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদী ও সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সময়ভিত্তিক কর্মকাঠামো প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। আর তা করতে না পারলে বিষয়টি প্রতিবছরই গণমাধ্যমের জন্য খবর তৈরির উপলক্ষ হবে মাত্র–বাস্তবে এ সমস্যার কোনোই সমাধান হবে না। আর এ ক্ষেত্রে চরম আক্ষেপের বিষয় এই যে, স্বাধীনতার একান্ন বছর পরও একই অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও দুর্নীতি নিয়ে একইরূপ আলোচনা করতে হচ্ছে। কিন্তু তা আর কতোদিন?

 

 

 

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button
error: Content is protected !!