বিনোদন

বিতর্কের মাঝেও যে কারণে প্রশংসার দাবিদার বিপিএল

<![CDATA[

ক্রিকেটের আধুনিক প্রযুক্তি ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম (ডিআরএস) নেই। মানসম্মত বিদেশি ক্রিকেটার নেই। সূচিতে গোলযোগ। আম্পায়ারদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। এতসব সমালোচনার মাঝেও এবারের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) বেশ কিছু কারণে প্রশংসার দাবিদার। অসংখ্য বিতর্কের ভিড়েও বিপিএলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।

গত ৬ জানুয়ারি মাঠে গড়ায় দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ বিপিএলের নবম আসর। আট বসন্ত পেরিয়ে যে লিগটি আরও বিস্তৃত আরও পরিপূর্ণ হওয়ার কথা, সেখানে কি না নেই ক্রিকেটের আধুনিক প্রযুক্তি ডিআরএস। খেলতে আসেননি ভালো মানের বিদেশি ক্রিকেটাররা। দেশের ক্রিকেটর বড় পোস্টার বয় সাকিব আল হাসান এ নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন আয়োজকদের। তার মতে, আয়োজকরা যথেষ্ট চেষ্টা করছেন না দেখে, এখনো এক জায়গায় আটকে আছে বিপিএল। মানহীন প্রতিযোগিতা হওয়ায় এখানে খেলতে আসেন না বিদেশি ক্রিকেটাররা।

গত ৪ জানুয়ারি এ নিয়ে সাকিব সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘বিপিএলের আয়োজকরা পারেনি নাকি চায়নি জানি না। বলা কঠিন। বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা, চাইলে না পারার কোনো কারণ আমি দেখি না। আমার ধারণা আমরা সৎ মনে চাইনি কখনও ওরকম কিছু করতে। এ কারণে এখন পর্যন্ত হয়নি।’

এ ছাড়া সমালোচনা আছে বারবার ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা বদল নিয়েও। আজকের ঢাকা ডমিনেটর্স গত আসরে ছিল মিনিস্টার গ্রুপ ঢাকা। তার আগে ঢাকা খেলেছে ডায়নামাইটস নামে। অথচ শুরুতে তাদের নাম ছিল ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্স। এভাবে নাম বদলেছে বিপিএলে অংশগ্রহণকারী সবগুলো দল। অল্প সময়ের জন্য এভাবে দল কিনে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো লোকসানে পড়ছে দেখে বিপিএলের উন্নতি হচ্ছে না বলে মনে করেন খুলনার টাইগার্সের কোচের দায়িত্বে থাকা খালেদ মাহমুদ সুজন।

এত সমালোচনার মাঝেও বিপিএল যখন মাঠে গড়াল তখন আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হলো নতুন বিতর্ক। ডিআরএসের বদলে যে এডিআরএস প্রযুক্তি ব্যবহার করছিল আয়োজকরা, সেটা নিয়ে বেশ অসন্তুষ্ট বিপিএলে অংশ নেয়া ক্রিকেটার, কোচ ও ম্যানেজমেন্ট। মাঠেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে তামিম ইকবাল, এনামুল হক বিজয়সহ একাধিক ক্রিকেটারকে। তাদের মধ্যে আবার অনেকে জানিয়েছেন, এডিআরএস থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।

কিন্তু এতকিছুর মাঝেও এবারের বিপিএল প্রশংসার দাবি রাখে বেশ কিছু জায়গায়। প্রথমেই প্রশংসা করতে হয় এবারের আসরের উইকেট নিয়ে। আন্তর্জাতিক অথবা ঘরোয়া ক্রিকেটে মিরপুরের উইকেট নিয়ে সব সময় ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে ক্রিকেটারদের। আর বিপিএলের মতো টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের জন্য শের-ই-বাংলার মন্থর উইকেট তো একেবারেই মানানসই ছিল না।

গত আসরে বিপিএলের প্রথম ইনিংসের গড় ছিল ১৪১.৩ রান। আর দুই ইনিংস মিলিয়ে ছিল ১৩৬.০৫। গত আসরে মিরপুরের মাঠে সমর্থকদের দেখার সৌভাগ্য মেলেনি ২০০ ছাড়ানো কোনো ইনিংসের। সর্বোচ্চ ইনিংসটা অবশ্য একেবারে খারাপ ছিল না। খুলনা টাইগার্সের বিপক্ষে ১৯০ রানের ইনিংস খেলেছিল চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স। তবে এ মাঠে প্রথমে ব্যাট করে ৯৬, ১০০ ও ১২৫ রানের ইনিংসও খেলতে দেখা গেছে দলগুলোকে। তবে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেট নিয়ে ছিল না কোনো অভিযোগ। গত আসরে দুইশ’ ছাড়ানো একমাত্র ইনিংসটি এসেছিল ওই মাঠেই। সেখানে রানের ফোয়ারা বইছে চলতি আসরেও।

আরও পড়ুন:  জৌলুস হারাচ্ছে বিপিএল

চট্টগ্রামে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়া ১০ ম্যাচের মধ্যে দুটিতেই দুইশ’ ছাড়ানো ইনিংস দেখেছে সমর্থকরা। প্রথমে ব্যাট করা দলের গড় ১৬১.৪ রান আর পরে ব্যাট করা দলের গড় ১৪৮.৮।

এবার অভিযোগ নেই মিরপুরের উইকেট নিয়েও। বিপিএল চট্টগ্রামে পাড়ি দেয়ার আগে এখানে হওয়া ৮ ম্যাচের গড় রান ছিল ১৫২.০৫। যেখানে প্রথমে ব্যাট করা দলের গড় ১৫৭.৩ এবং ১৪৬.৯ রান। ৮ ম্যাচের মধ্যে ছিল ২০০ ছাড়ানো একটি ইনিংসও।

মিরপুরের এমন বদলে যাওয়া উইকেট দেখে কিউরেটরকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন সাকিব-মাশরাফীরাও। গত ১১ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সাকিব বলেন, ‘এবারের উইকেট অনেক ভালো। মিরপুরে সাধারণত এতো ভালো উইকেট আমরা পাই না। কিউরেটরকে কৃতিত্ব দিতেই হয়। এ কারণেই এতো বেশি রান হচ্ছে। আর মাঠের খেলাটাও অনেক বেশি ভালো হচ্ছে। এক্সাইটিং হচ্ছে।’

এবারের আসরে রান সংগ্রহ কিংবা রান তাড়ায় মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার সিলেট স্ট্রাইকার্সকে থামাতে পারছে না কেউ। বিপিএল শুরুর দ্বিতীয় দিন তারা ফরচুন বরিশালের দেয়া ১৯৫ রান তাড়া করে ফেলে ৬ বল হাতে রেখেই। আর ১০ জানুয়ারি ঢাকা ডমিনেটর্সের বিপক্ষে তাদের হাত ধরে এসেছে প্রথম ২০০ ছাড়ানো ইনিংস। এবারের আসরে মিরপুরের উইকেট নিয়ে তাই সন্তুষ্টি ঝরেছে মাশরাফীর কণ্ঠেও। আসর শুরুর তিন দিন পর সংবাদমাধ্যমকে মাশরাফী বলেন, ‘উইকেট ভালো হলে খেলা সহজ হয়। এমনিতে উইকেট তো চট্টগ্রামে গেলেই শুধু ভালো পাওয়া যায়। (মিরপুরে) এমন উইকেট তো পাওয়া যায় না। তিন দিন যে উইকেট দেখলাম, দারুণ উইকেট। এমন উইকেট হলে কিছু ক্রিকেটার আমরা তৈরি করতে পারব। এটা খুব ভালো দিক যে এত সমালোচনার মধ্যেও মাঠের খেলাটা ঠিক আছে।’

এদিকে এমন সময়ে বিপিএল মাঠে গড়িয়েছে যখন কি না একই সময় প্রতিযোগিতায় নেমেছে ভারতের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আইপিএলের দলগুলোও। দক্ষিণ আফ্রিকায় চলমান এসএ টি-টোয়েন্টি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলমান ইন্টারন্যাশনাল লিগ টি-টোয়েন্টিতে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মালিকানায় আছে আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। আইপিএলের টিকিট পেতে এসব লিগের দিকেই ছুটেছে বেশিরভাগ বিদেশি ক্রিকেটার। দুই লিগের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামার সাহস করেনি পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল)। তবে চ্যালেঞ্জ নেয়ার সে সাহস দেখিয়েছে বিপিএলের আয়োজকরা।

তাছাড়া ডিআরএস প্রযুক্তি এবারের বিপিএলে একেবারেই থাকছে না বিষয়টি এমন নয়। রাউন্ড রবিন লিগ শেষে কোয়ালিফাইয়িং পর্বে থাকবে ডিআরএস। আয়োজকরা আগেই জানিয়েছে, তারা প্রথম থেকেই চেষ্টা করেছে ডিআরএস প্রযুক্তি রাখার। কিন্তু এ প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট লোকবল না থাকায় তারা শেষ পর্যন্ত ডিআরএস ব্যবস্থা করতে পারেনি।

এ বিষেয় বিসিবির সিইও নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ডিআরএস, বিশ্বব্যাপী একটা কোম্পানি এটি ডিল করে। ভারত সিরিজের সময় ডিআরএস ছিল আমাদের এখানে, কিন্তু ইকুইপমেন্ট আছে লোকবল নেই। কারণটা হচ্ছে আমাদের যে কোম্পানিটা সাপোর্ট দিচ্ছে ওই কোম্পানির যথেষ্ট জনবল দেয়ার মতো নেই। বাস্তবতা হলো গত দুই থেকে তিন মাস আগে আমাদের প্রোডাকশন টিম যারা কাজ করছে তারা যখন জানিয়েছে (ডিআরএস না পাবার ব্যাপারটি), আমরা কিন্তু আমাদের লেভেল থেকে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছি। এমনকি আইসিসিতেও। তাদের মাধ্যমেও চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু কারণে অ্যারেঞ্জ হয়নি। কারণ একই সময়ে বেশকিছু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চলছে এবং বেশকিছু ঘরোয়া ক্রিকেটও শুরু হয়ে গেছে। এ সমস্ত কারণে ডিআরএস আমরা ম্যানেজ করতে পারিনি।’

ডিআরএস না পেয়ে বিকল্প হিসেবে এডিআরএস প্রযুক্তি নিয়ে আসে আয়োজকরা। এ নিয়ে কিছু বিতর্ক চললেও এবং এটি নিখুঁতভাবে কাজ না করলেও অন্তত আম্পায়াররা যাচ্ছে তাই সিদ্ধান্ত দিয়ে দিতে পারছেন না। লেগ বিফোরের আউট নিয়ে ঝামেলা থাকলেও হাতে না লাগলেও ক্যাচ আউটের মতো বিতর্ক হচ্ছে না। এ ছাড়া বিপিএলে একেবারে ভালো মানের বিদেশি ক্রিকেটার নেই সেটাও বলা যাচ্ছে না। মোহাম্মদ আমির, মোহাম্মদ রিজওয়ান, হারিস রউফ, ইফতিখার আহমেদ, মোহাম্মদ হারিস, ওয়াসিম জুনিয়র, জনসন চার্লস, থিসারা পেরেরার মতো ক্রিকেটাররা এসএ টি-টোয়েন্টি বা আইএল টি-টোয়েন্টি না খেলে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগটিকে। চলতি আসরের কয়েক ম্যাচ খেলে গেছে সিকান্দার রাজা, মোহাম্মদ নবি, ডেডিভ মালানের মতো তারকা ক্রিকেটাররাও।

প্রাইজমানির দিক থেকেও প্রশংসার দাবিদার এবারের বিপিএল। বিপিএলের গত আসরে চ্যাম্পিয়ন দল পেয়েছিল ১ কোটি টাকা, রানার্সআপরা পেয়েছিল ৫০ লাখ টাকা। এবার দলগুলো পাচ্ছে দ্বিগুণ প্রাইজমানি। শিরোপাজয়ী দল পাবে ২ কোটি টাকা ও রানার্সআপ দল পাবে এক কোটি টাকা। এ ছাড়া টুর্নামেন্ট সেরা ক্রিকেটার পাবেন ১০ লাখ টাকা।

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button
error: Content is protected !!