Feni (ফেনী)উপ-সম্পাদকীয়সর্বশেষ

বিদেশি বিনিয়োগ, গর্জন দৃষ্টে বর্ষণটা হচ্ছেনা

কিছু উন্নতি সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো বাধা হয়ে আছে দুর্নীতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সীমিত অর্থায়নের উপকরণ, আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব ও শ্রম আইনের দুর্বল প্রয়োগ।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন,আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা প্রায়ই বাংলাদেশে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহ করে। নিয়ন্ত্রক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব বাংলাদেশে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের হতাশ হতে হয়। তারা আরো বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং বিভাগে শীর্ষ ও মধ্য স্তরের কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি, কৌশলগত সংস্কার উদ্যোগ এবং রুটিন দায়িত্ব সময়মতো কাজ বাস্তবায়নে বাধা দেয়।

তারপরও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের আয়োজনে কমতি নেই। চেষ্টা আছে। তা বৈশ্বিক করোনার পূর্বাপর এবং করোনার মাঝেও। কিন্তু, কার্যকরের মাত্রা ওই পর্যায়ে নয়। গর্জন দৃষ্টে বর্ষণটা হচ্ছে না। চুক্তি, ঘোষণা, অনুমোদনের ধাপগুলোর পর বাস্তবায়ন কম। বৈশ্বিক মহামারি করোনার ঠিক আগের সময়টায় ২০১৯-২০ সালে বিদেশি বিনিয়োগের বেশ ক’টি পাইপ লাইন তৈরি হয়। কিন্তু করোনার তোড় তা বরবাদ করে দেয়। ঝুলে থাকা বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলোর বেশিরভাগও অনিশ্চিত হয়ে যায়। এর মাঝেও বিদায় নেয়া ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে নিট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন (১১৬ কোটি) মার্কিন ডলার। বাংলা টাকায় তা প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি।

বিদেশি বিনিয়োগের হালনাগাদ ঘোষণায় নতুন করে যোগ হয়েছে জাপান। এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ তুলনামূলক কম স্বীকার করে ঢাকায় নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেছেন, কার্যকর উদ্যোগ ও কিছু নীতি সংস্কার করলে এক দশকে দশগুণ বাড়তে পারে তাদের বিনিয়োগ। বাংলাদেশ জাপানি উদ্যোক্তাদের কাঙ্খিত বিনিয়োগ গন্তব্য এ মন্তব্য করে তিনি জানান, আড়াইহাজার ইকোনমিক জোন চালু হলে এক বিলিয়ন ডলার বাড়বে জাপানের বিনিয়োগ। রাষ্ট্রদূতের ঘোষণা, পরামর্শ, আশ্বাস মেলানো উপরোক্ত মন্তব্যগুলো বাংলাদেশে কেবল জাপান নয়, আরও বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগের এক সোনালী বার্তা। বাংলাদেশকে বিদেশি বিনিয়োগের নীতি সংস্কারের তাগিদ আসছিল দেশি-বিদেশি আরও নানা মহল থেকেই। সরকার নীতিগতভাবে এ সংস্কারে সম্মত। কিছু সংস্কার করেছেও। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডা’র ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুসহ কিছু পদক্ষেপ জাপানসহ কিছু দেশের পছন্দ হয়েছে।

আসিয়ানসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জাপানে বিনিয়োগ কম হলেও একেবারে কম নয়। ডিসেম্বরেই চালু হচ্ছে মেট্টোরেল। জাপানের উন্নয়ন সং¯’া জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে এ প্রকল্প। কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ছাড়াও সমুদ্র বন্দরসহ অন্যান্য অবকাঠামো বাস্তবায়ন করছে দেশটি। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চালু হ”েছ বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল, যেখানে বিনিয়োগ আসছে এক বিলিয়ন ডলার। সামনের দিনগুলোতে তা আরও বাড়-বাড়ন্তের সমূহ সম্ভাবনার মধ্যে পড়ল রাষ্ট্রদূতের টোকা। কুটনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে তা বেশ চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।

আরও কিছু কারণে নতুন নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাবও আসছে। বিডার তথ্যানুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত চীন ও কোরিয়া থেকে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। তুরস্ক ও ইতালির উদ্যোক্তারাও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ইতালির উদ্যোক্তাদের নজর বেশি তৈরি পোশাকশিল্প খাতে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির পর ইতালিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তৈরি পোশাক রফতানি হয়। তাছাড়া দেশটি থেকে ওই খাতের মেশিনারিজ আমদানি হয় এ খাতে। তুরস্কের উদ্যোক্তাদেরও বাংলাদেশের গার্মেন্টসের দিকে বেশ ঝোক। আগ্রহ আছে কৃষি, আইটি, ওষুধ উপকরণ, অটোমোবাইল, অটো পার্টস খাতেও। এরইমমধ্যে তুরস্কের দুটি কোম্পানি আর্সেলিক এবং এ এস বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। তারা তুরস্কের আরো বিনিয়োগকারী টেনে আনবেন বলে তথ্য আছে সরকারের কাছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ-বেজার তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত একশ’র মতো অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বর্তমানে কাজ চলছে ২৮টির। এগুলোতে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ১০০ কোটি ডলার। এছাড়া বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় হচ্ছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর। ৩০ হাজার একর জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত শিল্পনগরটিতে নতুন করে দেশি-বিদেশি ১৫টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এছাড়া জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন ছয়টি এবং কক্সবাজারের সাবরাং পর্যটনকেন্দ্রে সাতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য ও সেবা রফতানি হওয়ার আশা করছে সরকার। আর প্রত্যক্ষ -পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হবে এক কোটি মানুষের।

অনেকেরই জানা, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি চীনের। ২০২১ ও ২০২২ সালে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই হিসেবে বিডায় যে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে, সেখানেও এ তথ্য রয়েছে। চীন থেকে প্রায় ৭৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। তারপরই দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান। পরিমাণ প্রায় ১৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কারণে-অকারণে ভারত প্রসঙ্গ এলেও বাংলাদেশে দেশটির বিনিয়োগ বেশ কম। ভারতের সঙ্গে প্রতি বছর বাংলাদেশের ১০০০ কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য হলেও এদেশে তাদের বিনিয়োগ অনেক কম। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে মাত্র ৬৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে ভারত। এ বাস্তবতা থেকেই এবারের ভারত সফরেও দেশটির ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই লক্ষ্যে ভারতীয় শীর্ষ শিল্প উদ্যোক্তা গৌতম আদানির সঙ্গে আলাদা বৈঠকও করেছেন তিনি।

তথ্য এবং আশাবাদের প্রশ্নে কমতি না থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টি ঝুলে যাচ্ছে বাস্তবায়নে। তা অবশ্যই কিছু সমস্যার কারণে। মোটা দাগে এক ডজন সমস্যার কথা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের রিপোর্টে। উল্লেখযোগ্য সব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ চেষ্টা সফল হলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অংকে অবিশ্বাস্য ছন্দ যোগ হবে নিশ্চিত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছে, যা গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। টানা আট মাস ধরে বাড়তে বাড়তে ২০২২ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকটি ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে ১১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে উঠেছিল।

গত অর্থবছরে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা মোট বিনিয়োগের প্রায় ১৭ শতাংশ বিনিয়োগ করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে সিঙ্গাপুর। তারা মোট বিনিয়োগের ১৬ শতাংশের মতো বিনিয়োগ করেছে। তৃতীয় অবস্থানে নেদারল্যান্ডসের বিনিয়োগ ৮ শতাংশ। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, চীন, মিসর, যুক্তরাজ্য, হংকং এবং অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ রয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগে ইতিবাচক ধারায় সন্তোষ প্রকাশ করে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের চেম্বার অ্যামচেমের সভাপতি বলেছেন, করোনার ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও আমদানি-রফতানি বাড়ছে। অন্য সূচকগুলোও ভালো। তিনি বলেন, রাজনীতিতে অ¯ি’রতা নেই দীর্ঘদিন। পদ্মা সেতু চালু হয়ে গেছে। মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু কর্ণফুলী টানেলসহ কয়েকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও এ বছরেই চালু হবে। সব মিলিয়ে দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগেও একটি ভালো পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। এখন এটাকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিলে দেশে এফডিআই আরও বাড়বে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে এফডিআইয়ের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ব্র্যান্ডিং।

এটা ঠিক, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে আমরা এখনও আমাদের ব্র্যান্ডিং যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারিনি। এছাড়া আমাদের বন্দরের সমস্যা আছে। এতদিনেও আমরা আমাদের বন্দরের অটোমেশন করতে পারিনি। এগুলো ঠিক হলে বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ আসবে বলে আশার কথা শুনিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সূত্রে জানা যায়, আগের বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় তৈরি পোশাক খাতে কোরিয়া, চীন ও হংকং থেকে উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এছাড়া বিদ্যুৎ, ব্যাংক, টেলিকমিউনিকেশন খাতেও কিছু বিনিয়োগ এসেছে। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, বিদেশি কোম্পানিগুলো তিনভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে। মূলধন হিসেবে নগদ বা শিল্পের যন্ত্রপাতি হিসেবে, বাংলাদেশে ব্যবসা করে অর্জিত মুনাফা বিদেশে না নিয়ে পুনর্বিনিয়োগ করে এবং এক কোম্পানি অন্য কোম্পানি থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারে। এ তিন পদ্ধতির যেকোনোভাবে দেশে বিনিয়োগ এলে তা এফডিআই হিসেবে গণ্য করা হয়। তারপরও ২০১৫-১৬ থেকে ২০২১-২২ এই পাঁচ অর্থবছরে দেশে মোট ২৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার এফডিআই এসেছে। এর মধ্যে নিট এফডিআই’র পরিমাণ ১৭ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার।

বিদেশি বিনিয়োগ টানার অসংখ্য ক্ষেত্র বাংলাদেশে রয়েছে। প্রয়োজন শুধু যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করা, পাশাপাশি বাংলাদেশকে স্থায়ী পলিসি গ্রহণের জন্য অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে জোটভুক্ত হওয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে, এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থায়ী সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনসহ সর্বোপরি উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!