খেলা

বিশ্বের দেশে দেশে অর্থনৈতিক মন্দা-মহামন্দার ইতিহাস

<![CDATA[

কোনো দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ভাটা দেখা গেলে দেশটিতে মন্দার ঝুঁকি বাড়বে। টানা কয়েকটি প্রান্তিক কোনো দেশটির অর্থনীতি সঙ্কুচিত হলে সে দেশটি মন্দায় আক্রান্ত হয়েছে বলা হয়। আর এ অর্থনৈতিক মন্দা টানা কয়েক বছর স্থায়ী হলে এবং দেশটির সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ওপর এর ব্যাপক প্রভাব দেখা দিলে তাকে মহামন্দা বা ডিপ্রেশন নামে অভিহিত করা হয়। কোনো দেশ বা অঞ্চলে মাঝে মাঝেই মন্দা হানা দিলেও মহামন্দা কদাচিৎ ঘটে।

করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় গতি হারিয়েছে প্রায় পুরো বিশ্বের অর্থনীতি। বিশ্ব এ মুহূর্তে আরেকটি অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকির সম্মুখীন সে ব্যাপারে অর্থনীতিবিদরা মোটামুটি নিশ্চিত হলেও তার ধাক্কা কেমন হতে পারে সে ব্যাপারে তারা নানা হিসাব কষছেন।

মন্দা ও মহামন্দার লক্ষণ

সাধারণ মন্দা ও মহামন্দার লক্ষণগুলো প্রায় এক রকম হলেও মন্দার থেকে মহামন্দার প্রতিক্রিয়া অনেক তীব্র হয়। মন্দা সাধারণত কয়েক মাসের মধ্যেই কেটে গেলেও মহামন্দা থেকে উত্তরণে কয়েক বছর, এমনকি দশক পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

বিশ্বে মন্দার ইতিহাস

আধুনিক অর্থ ব্যবস্থায় অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে প্রথম মন্দা দেখা দেয়। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। যার সময়কাল ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সাল। একে মহামন্দা হিসেবে অভিহিত করা হয়। গত ২০০ বছরে মাঝে মাঝেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কিংবা অঞ্চলে মন্দা হানা দিয়েছে। আর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মন্দাকেই মহামন্দা নামে অভিহিত করা হয়। কারণ আর কোনো মন্দা বিশ্বের কোনো প্রান্তে এত দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয়নি।

আরও পড়ুন: প্রভুত্ব বিস্তার নাকি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, চীনা বিআরআইয়ের উদ্দেশ্য কী?

১৭৭২ সালে ইউরোপের ঋণ সংকট

১৭৭২ সালে ইউরোপের অর্থনৈতিক সংকটটির শুরু লন্ডনে হলেও দ্রুত তা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। একে আধুনিক অর্থব্যবস্থার ইতিহাসের প্রথম মন্দা বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

১৭৬০ এর দশকের দিকে ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোতে বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রচুর পরিমাণে সম্পদ সংগ্রহ করে। উপনিবেশগুলো থেকে আসা সম্পদের ঢেউ ব্রিটিশ ব্যাংকগুলোর মধ্যে অতি আত্মবিশ্বাস এবং দ্রুত প্রসারণের একটি প্রবণতা তৈরি করে। তবে এ সম্পদের ঢেউটি ১৭৭০ সালের দিকে স্তিমিত হয়ে আসে। ফলে ভেঙ্গে পড়ে ব্রিটিশ ব্যাংকিং খাত।

১৭৭২ সালের ৮ জুন দিনটি বিশ্বের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। ওই দিন ব্রিটিশ ব্যাংকিং হাউস নিল, জেমস, ফোর্ডিস ও ডাউনের অন্যতম অংশীদার আলেক্সান্ডার ফোর্ডিস তার বিশাল ঋণ পরিশোধের দায় থেকে বাঁচতে ফ্রান্সে পালিয়ে যান। এ সংবাদ দাবানলের মতো পুরো ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাতে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। আমানতকারীরা তাৎক্ষণিক নগদ টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ব্রিটিশ ব্যাংকগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। পরে ইংল্যান্ডের এ সংকট দ্রুত স্কটল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের বিভিন্ন অংশ এবং ব্রিটিশ-আমেরিকান উপনিবেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মন্দা

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন করেছিল। সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো পাল্টা অস্ত্র হিসেবে তেলকে ব্যবহার করেছিল। তারা তেলের উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যার কারণে হু হু করে তেলের দাম বেড়ে যায়। পাশাপাশি ইসরাইলকে সামরিক সহায়তাদানকারী সব দেশে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেয় আরব দেশগুলো। সারা বিশ্বে তেলের সংকট তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের লম্বা সারি দেখা দেয়। এর ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অর্থনৈতিক স্থবিরতার তৈরি হয় এর ফলে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রে দেখা দেয় অর্থনৈতিক মন্দা।

১৯৯৭ এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সংকট

বিদেশি মুদ্রার অভাবে ১৯৯৭ সালের ২ জুলাই থাই সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে স্থিত বিনিময় হার থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়, যা এশিয়ার আর্থিক বাজারে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এ সময় আতঙ্কিত হয়ে থাইল্যান্ড থেকে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ সরিয়ে নিতে থাকেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। থাইল্যান্ড থেকে শুরু হওয়া এ অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। যার জেরে এ দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়।

এ সংকটের আগে ‘এশিয়ান টাইগার’ নামে পরিচিত দক্ষিণ পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিপুল বিদেশি অর্থ ঢুকে পড়ে। অত্যধিক মাত্রায় বিদেশি ঋণ বেড়ে গিয়েছিল। এর ফলে দেশগুলোর অর্থনীতিতে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। যার প্রভাব পড়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হারে। এ পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে বিনিয়োগকারী আস্থা হারিয়ে অর্থ তুলে নিতে থাকলে এ দেশগুলোর অর্থনীতি ধসে পড়ে।

আরও পড়ুন: বিশ্ব কি নতুন অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি?

যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিশের দশকের মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশন

গত শতকের ত্রিশের দশকে পশ্চিমা বিশ্ব ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা দেখেছিল। যা ইতিহাসে ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা ‘মহামন্দা’ নামে পরিচিত। পূর্বের দেশগুলোর মঙ্গা বা দুর্ভিক্ষের চেয়ে পশ্চিমের এ অর্থনৈতিক মহামন্দার প্রেক্ষাপট হয়তো বেশ ভিন্ন। কিন্তু সে সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় সংঘটিত হয়েছিল, এর তুলনীয় বিপর্যয় খুব কমই দেখেছে বিশ্ব।

১৯২৯ সালের অক্টোবরে মাত্র দুই দিনে প্রায় ধ্বংস হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন নতুন বিনিয়োগকারীরা। আর এর প্রভাব পড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের ছোট-বড় সকল ক্ষেত্রে।

কয়েকদিনের মধ্যে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদনে ধস নামে। লোকসানের শঙ্কায় বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই শুরু করে। কোথাও কোথাও ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে কর্মীদের মেরে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটে। মাত্র এক বছরের মাথাতেই বেকার হয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের এক কোটি মানুষ। ১৯৩১ সালে গিয়ে তা ঠেকে দেড় কোটিতে।

এ মহামন্দার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও জনজীবনেও মারাত্মকভাবে পড়ে। দেশটির একতৃতীয়াংশ মানুষই বেকার হয়ে পড়ে।  চাকরিহারা পরিবারগুলোতে বিষন্নতা দেখা দেয়। এ জন্য এ মহামন্দাকে একই সঙ্গে ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ নামেও অভিহিত করা হয়। এ মন্দার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সীমা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও। আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিলো সর্ববৃহৎ পতন। প্রায় এক দশক স্থায়ী এ গ্রেট ডিপ্রেশন শেষ হয় ১৯৩৯ সালে। তবে এর রেশ থেকে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও।

 

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!