বিশ্ব কি নতুন অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি?
<![CDATA[
সাধারণভাবে কোনো দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ভাটা দেখা গেলে তাকে মন্দা বা রিসিশন নামে অভিহিত করা হয়। অর্থনীতির ভাষায়, টানা কয়েকটি প্রান্তিকে কোনো দেশের অর্থনীতিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি ঘটলে তাকে মন্দা বলে অভিহিত করা হয়। মন্দার সময় সাধারণত দেশের ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প উৎপাদন ধুঁকতে থাকে। মানুষ চাকরি ও ক্রয়ক্ষমতা হারায় এবং অর্থনীতির সামগ্রিক সবগুলো সূচক নিম্নমুখী হয়।
এমন মন্দা টানা কয়েক বছর স্থায়ী হলে এবং জনগণ সমাজ সংস্কৃতি ও রাজনীতির ওপর এর ব্যাপক প্রভাব দেখা দিলে তাকে মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশন নামে অভিহিত করা হয়।
যেমন-যুক্তরাষ্ট্র গত শতকের ত্রিশের দশকে পড়ে মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশনে। মন্দা মাঝেমধ্যেই অর্থনীতিতে হানা দিলেও মহামন্দা কদাচিৎ ঘটে।
করোনা মহামারি ও এর পরপরই ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্ব বর্তমানে আরও একটি মন্দার মুখোমুখি। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদরা মোটামুটি নিশ্চিত হলেও এর আঘাতের তীব্রতা কেমন হবে, সে ব্যাপারে নানা হিসাবনিকাশ কষছেন তারা।
অর্থনীতির ভাষায় মন্দা কি?
সাধারণত একটি অর্থবছরের পরপর দুইটি প্রান্তিকে কোনো দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে যদি নিম্নমুখী বা ঋণাত্মক ধারা অব্যাহত থাকে তবে তাকে মন্দা বলা হয়। মন্দার সময় সাধারণত মানুষ কাজ হারায়, তাদের খরচ করার সামর্থ্য কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনোমিক রিসার্চের মতে, অর্থনৈতিক কার্যক্রমের দৃশ্যমান নিম্নমুখী প্রবণতা টানা কয়েক মাস অব্যাহত থাকলে সেই অবস্থাকে মন্দা বলা যেতে পারে। এর প্রভাবে জিডিপি, আয় ও শিল্প উৎপাদন কমে যাবে। সেই সঙ্গে বেড়ে যাবে বেকারত্বের হার।
অর্থনীতির গ্রাফের আকৃতিতে মন্দার প্রকারভেদ
অর্থনীতিবিদরা মন্দাকে ভিশেপ, ইউশেপ, এলশেপ কিংবা ডব্লিউশেপ হিসেবে অর্থনীতির সূচকের গ্রাফে ব্যাখ্যা করে থাকেন।
অর্থনীতির বিভিন্ন গ্রাফে সূচকগুলো ওঠানামার আকৃতি যদি ভিশেপ হয়, তাহলে বুঝতে হবে মন্দা ক্ষণস্থায়ী। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের মন্দা হয়েছিল ১৯৫৪ সালে এবং ১৯৯০-৯১ সালে।
আবার মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির গ্রাফে এর সূচকের ওঠানামা হয় ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরটির মতো। আবার মন্দা উপর্যুপরি হলে এর সূচকের ওঠানামা গ্রাফে দেখাবে ‘ডব্লিউ’ এর মত। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪-৭৫ সালের মন্দা ছিল ইউ আকৃতির। আবার ১৯৪৯ ও ১৯৮০-৮২ সালের মন্দা ছিল ডব্লিউ আকৃতির। একইভাবে জাপানের ১৯৯৩-৯৪ সালের মন্দা ছিল ইউ আকৃতির। আবার ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সালের জাপানের পরপর নয়টি প্রান্তিকের মধ্যে আটটি প্রান্তিকের গ্রাফ চিত্রে মন্দা দৃশ্যমান হয়েছে এলশেপ হিসেবে।
আরও পড়ুন: বন্ধ নর্ডস্ট্রিম ওয়ান: ইউরোপের জ্বালানির ঘুঁটি মস্কোর হাতেই
আরেকটি মন্দা কি ধেয়ে আসছে
প্রথমে কোভিড মহামারি, পরবর্তীতে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এখন দেশে দেশেই অর্থনৈতিক সংকট। উন্নত দেশগুলোতে দেখা গেছে মূল্যস্ফীতি আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা দিয়েছে তারল্য সংকট।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জনমনেও মন্দাভীতি জেঁকে বসেছে বেশ ভালোভাবেই। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিষয়ক পোর্টাল ‘ম্যাগনিফাই মানি’ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক মনে করছেন যে মন্দার লক্ষণ এরইমধ্যে শুরু হয়েছে।
অর্থনীতিতে মন্দার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
মন্দা কোনো দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। যেমন-একটি প্রতিষ্ঠান যদি বুঝতে পারে যে মন্দা ধেয়ে আসছে, সেক্ষেত্রে তারা নতুন করে বিনিয়োগ নাও করতে পারে। পাশাপাশি খরচ কমানোর জন্য কর্মীও ছাঁটাই করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে যখন একটি দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এ ধারায় চলে, তখনই মন্দার সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।
কিভাবে বোঝা যায় অর্থনীতি মন্দাক্রান্ত
একটি দেশের অর্থনীতি আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দায় আক্রান্ত কি না সেটা বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় রয়েছে। ১৯৭৪ সালে অর্থনীতিবিদ জুলিয়াস সিশকিন মন্দার ব্যাপারে কয়েকটি সূত্রের অবতারণা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো, পরপর দুইটি প্রান্তিক যদি ঋণাত্মক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে, তবে বুঝতে হবে সেই দেশ মন্দার মধ্যে রয়েছে। কারণ একটি স্বাস্থ্যবান অর্থনীতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু যদি তা পরপর দুইটি প্রান্তিকে সঙ্কুচিত হয়, তবে বুঝতে হবে সেই দেশের অর্থনীতির ভোগার পেছনে মারাত্মক কোনো গড়বড় আছে। শিসকিনের মন্দার এ তত্ত্বকেই বর্তমান সময়ে আদর্শ মানা হচ্ছে।
মন্দার কারণ কি
বিভিন্নভাবেই মন্দার শুরু হতে পারে। এমনকি যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে শুরু নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতির থেকেও মন্দার উদ্ভব হতে পারে। আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণেও অতীতে মন্দা হতে দেখা গেছে। ৭০ এর দেশকে ওপেক যুক্তরাষ্ট্রকে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রে তেলের হাহাকার দেখা দেয়। জ্বালানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তেলের পাম্পগুলোতে দেখা দেয় লম্বা লাইন। পাশাপাশি সাম্প্রতিক করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বেই অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এটাকেও আকস্মিক অর্থনৈতিক আঘাত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ব্যালেন্স শিট রিসিশন বা খাতাকলমের মন্দা
সাধারণত কোনো রাষ্ট্রের অত্যধিক ঋণগ্রস্ততা, অথবা ফুলে ওঠা রিয়েল এস্টেট বা আর্থিক খাতের পতনের ফলে এ ধরনের মন্দা হতে পারে। এসব কারণে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষকে একইসঙ্গে ঋণ পরিশোধ করতে হলে এ ধরনের মন্দা ঘটে।
আবার কোনো দেশ যদি সাধ্যের অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে থাকে যা এক পর্যায়ে তাদের শোধ দেয়ার সাধ্যের বাইরে চলে যায় তখনও মন্দা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ভাবে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে যায় দেশগুলো। সাম্প্রতিক এ পরিস্থিতি শ্রীলঙ্কায় দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানও সেই পথে হাঁটছে।
আরও পড়ুন: প্রভুত্ব বিস্তার নাকি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, চীনা বিআরআইয়ের উদ্দেশ্য কী?
অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় বিনিয়োগও মন্দার কারণ
যখন আবেগের বশে মানুষ না বুঝেই কোনো খাতে বিনিয়োগ করতে থাকে তখন এর ফলাফল খারাপ হতে বাধ্য। সাধারণত দীর্ঘ সময় একটি দেশের অর্থনীতি ভালো থাকার পর এ ধরনের পরিস্থিতি আসতে পারে। অনেকদিন অর্থনীতি ভালো থাকায় বিনিয়োগকারীদের অত্যধিক ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। তারা অতিরিক্ত লাভের আশায় অর্থনীতির সূচক বিশ্লেষণ না করেই আবেগের বশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন, ফলে তৈরি হয় বাড়তি অর্থের বুদবুদ।
এক সময় এ বুদবুদ ফেটে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের পথে বসতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ৯০ সালের মন্দার সময় এমন অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে শেয়ারবাজার ধসে গিয়েছিল।
অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি
নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অংশ। কিন্তু এ মূল্যস্ফীতি যখন অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলে যায় তখন বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে দেয় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে। এদিকে আবার উচ্চ সুদের হার তখন দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে থামিয়ে দেয়। ৭০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছিলো ফেডারেল রিজার্ভ, যার হাত ধরে তৈরি হয় মন্দা।
]]>




