ভারতের কেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত?
<![CDATA[
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চলতি মেয়াদে এটাই হয়তো শেখ হাসিনার ভারতে শেষ সফর। বঙ্গবন্ধু কন্যা ও এই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ভারতের কৃতজ্ঞ থাকার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গত ১৩ বছরে, হাসিনা তার দেশের মৌলবাদী এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। যে মৌলবাদিরা ছিল বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের প্রতি হুমকিস্বরূপ এবং তীব্রভাবে ভারতবিরোধীও।
তিনি বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত ভারতীয় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পরও শেখ হাসিনা এই কাজটি হাতে নিয়েছিলেন – এমনকি কথিত ইসলামপন্থিদের কাছ থেকে তিনি বাধাপ্রাপ্তও হয়েছিলেন। এই শক্তি পাকিস্তান আমলে কয়েক দশক ক্ষমতাশালীও ছিল।
১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার যুদ্ধের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আবদুল কাদের মোল্লা এবং মতিউর রহমান নিজামীসহ বেশ কয়েকজন রাজাকারের ফাঁসি, যারা যুদ্ধের দৌড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে কেবল সহায়তা করেনি বরং স্বাধীনতার নামে বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংসতা চালিয়েছিল।
ইতিহাসকে যদি পুনরুত্থিত করা যায়, তাহলে দেখা যায়- ১৬ জুন, ১৯৭১ তারিখে পটিয়ায় হিন্দুদের পুরো একটি গ্রামে গণহত্যার জন্য দায়ী ছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আবদুল কাদের মোল্লা ৩৪৪ জনকে হত্যা এবং ১১ বছরের একটি মেয়েকে ধর্ষণের জন্য দায়ী ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ এতটাই উচ্চারিত হয়েছিল যে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার শাহবাগ চত্বরে একটি বিক্ষোভ মঞ্চ হয়েছিল, যা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ড এবং জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানায়।
যাই হোক, গণ্যমান্যদের দ্বারা ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ঘটনা বর্ণনা করার জন্য ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করা সত্ত্বেও ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় গণহত্যার অভিযোগটি কখনোই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল দ্বারা তদন্ত করা হয়নি। মূলত সে সময় বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষপাতমূলক ভূমিকার কারণে তেমনটা হয়েছিল, যা স্পষ্টতই পাকিস্তানের বিচ্ছেদের পক্ষে ছিল না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গণহত্যা এবং তা ক্রমাগত এড়ানোর কৌশল উভয় ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের ভূমিকা একটি প্রমাণিত সত্য।
যাই হোক, বর্তমানের প্রাথমিক উদ্বেগ বাংলাদেশে চীন যে ভারত-বিরোধী ভূমিকা পালন করছে তার সাথে সম্পর্কিত। একটি ‘ভারসাম্যমূলক কাজ’ সত্ত্বেও হাসিনা দুই এশিয়ান বৃহৎশক্তির মধ্যে তা সমন্বয় করতে সক্ষম হয়েছেন।
বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমাজের আরেকটি অস্পষ্ট দিক হলো ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ে মতানৈক্য। সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশি যারা বাংলাভাষী জাতীয়তাবাদের বিষয়ে উদ্বিগ্ন, তারাই আবার পাকিস্তানি অযৌক্তিক ধর্মীয় আধিপত্য এবং এমনকি কট্টরপন্থি সালাফিবাদের সাথে মুসলমানদের হৃদ্যতার যোগসূত্র খুঁজে পান। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা এবং রাজনৈতিক পরিবেশের পার্থক্য।
আদিকাল থেকে দুটি স্বতন্ত্র সামাজিক গোষ্ঠী বাংলাদেশে বিদ্যমান। একটি হলো আশরাফি বা তুর্কি-পার্সিয়ান বা আরব বংশোদ্ভূত উত্তর ভারতীয় মুসলমান যারা বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেছে কিন্তু তাদের দেশীয় সংস্কৃতি ধরে রেখেছে।
অন্যটি অংশটি অত্রবীদের নিয়ে গঠিত, যাদের বেশিরভাগ নিম্নবর্ণের হিন্দু বাঙালি যারা ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে। আশরাফিরা ছিল পাকিস্তানের প্রতি অত্যন্ত উৎসাহী এবং ফলস্বরূপ ১৯৪৭-৭১ সালের মধ্যে তারা পাকিস্তানিদের দ্বারা নানাভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
অন্যদিকে অত্রবীরা তাদের বাঙালি পরিচয়ের প্রতি অনুগত ছিল এবং বিবাহ পূর্ব অনুষ্ঠানের সময় কনের গায়ে হলুদ লাগানো এবং পয়লা বৈশাখ (বাঙালি নববর্ষ) পালনের মতো হিন্দু রীতিনীতি পালন করে চলেছে। এরাই মূলত আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এবং বাঙলাভাষী জাতীয়তাবাদের জন্য শক্তিশালী ভোটার।
এ কে ফজলুল হক, যিনি ব্রিটিশ ভারতের সময় বাংলার প্রথম এবং দীর্ঘতম সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তিনি ছিলেন একজন অত্রবী। এমনকি হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়কেও তিনি সমর্থন করেছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসকরা হককে অপসারণ করে এবং জিন্নাহ সমর্থক (একজন আশরাফী) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রতিষ্ঠা করে। অখণ্ড বাংলা গঠনের জন্য হকের আগ্রহ এবং প্রচেষ্টা (প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ের শেষ অবধি শরৎ বসুর সাথে বৈঠক) নথিভুক্ত তথ্য। দুই বাংলাদেশের গল্প তাই কল্পনার কোনো রূপ নয়।(দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস,৫ সেপ্টেম্বর,২০২২)
লেখক-দক্ষিণ এশীয় নিরাত্তা ও জঙ্গিবাদ বিশ্লেষক।
ভাষান্তর: রায়হানা রহমান
]]>




