ভারত-মিয়ানমার বন্ধুত্ব আসলে কেমন
<![CDATA[
মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে কোনঠাসা করার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়েই একটা জোর আলোচনা চলছে। সেই আলোচনার সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে দেশটির জান্তার সঙ্গে বিশ্বের দুই একনায়ক শাসিত দেশ রাশিয়া ও চীনের দহরম-মহরম সম্পর্কের প্রসঙ্গ। সেই আলোচনায় বিস্ময়করভাবে অনুপস্থিত ভারত।
গত বছরের (২০২১) শুরুতে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটা সরকার উৎখাত করে ক্ষমতার দখল নেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। কিন্তু সেনার এ ক্ষমতা দখল মেনে নেয়নি দেশটির গণতন্ত্রপ্রেমী জনতা। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছে। যে কারণে দুই হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
মিয়ানমার জান্তার বিরুদ্ধে দেশটির গণতন্ত্রপন্থী জনতার লড়াই-সংগ্রামে পুরো বিশ্বই সমর্থন দিয়ে আসছে। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ও মিয়ানমারের অন্যতম বড় প্রতিবেশি হওয়া সত্ত্বেও শুরু থেকেই মিয়ানমার জান্তাকে রুষ্ট করে এমন কাজ থেকে বিরত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ভারত।
সদ্য সমাপ্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের কথাই ধরা যাক। মালয়েশিয়া ও পূর্ব তিমুরের মতো আঞ্চলিক প্রতিবেশি অথচ দূরবর্তী দেশ হওয়া সত্ত্বেও অধিবেশনে মিয়ানমার ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপহীনতার ও ব্যর্থতায় হতাশা প্রকাশ করেছে। শুধু তাই নয়, দেশগুলোর কর্মকর্তারা রীতিমতো হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত প্রতিবেশি দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা হুমকিতে ফেলে দিতে পারে।
অথচ মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ হয়েও তেমন কোনো বক্তব্য-বিবৃতি তো নয়, মিয়ানমার জান্তা সরকারকে সহায়তা দেয়ার বিষয়টি সবার সামনে অকপটে প্রকাশ করেছে ভারত। অধিবেশনে দেশটির প্রতিনিধি অবলিলায় জানান, ‘আমরা মিয়ানমারকে ১০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য সহায়তা ও ভ্যাকসিনের চালান পাঠিয়েছি।’
আরও পড়ুন: রাখাইনে মিয়ানমারের ২০ সেনা নিহত
মূলত অভ্যুত্থানের পর আগের মতোই ভারত জান্তা সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কই বজাই রেখেছে। কূটনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং এমনকি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সেই সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। যেমন, গত সপ্তাহেই জান্তা সরকারের কৃষি, গবাদিপশু ও সেচ বিষয়ক মন্ত্রী তিন হতুত উ’র নেতৃত্বে বড় একটি প্রতিনিধি দল ভারত সফর করেছে।
প্রতিনিধি দলটি মূলত ভারতের কৃষি গবেষণা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইসিআরএ) পরিদর্শন করে। ভারতের বীজ উৎপাদন বিষয়ক রাষ্ট্রীয় সংস্থা ‘ন্যাশনাল সীড কর্পোরেশনে’র (এনএসসি) সঙ্গে সহযোগিতার ভিক্তিতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলেছে, সফরের উদ্দেশ্য হলো ভারত থেকে শিম ও ছোলা-মশুরের মতো ডালের বিভিন্ন প্রজাতির বীজ সংগ্রহ করা। বলা হয়, দেশের নাজুক অর্থনীতি টেনে তুলতে জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং এখন শিম ও ছোলা জাতীয় পণ্যের উৎপাদন ও রফতানির ওপর জোর দিচ্ছেন।
ওই প্রতিনিধি দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ড. জ উ নামের মিয়ানমারের একজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ। সেনা অভ্যুত্থানের পরপরই জান্তা সরকারকে একটি অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন: আরও চার রুশ যুদ্ধবিমান পাচ্ছে মিয়ানমার
যার লক্ষ্য দেশ শাসনে সেনার হাত আরও শক্তিশালী করা। তবে সম্প্রতি তিনি সেনা-জনতা সম্পর্ক উন্নয়নের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, অভ্যুত্থানের পর থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ যে বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হয়েছে সেগুলোর অবসানে এর প্রয়োজন রয়েছে।
সফরকালে প্রতিনিধি দলটি ভারতের শস্য বিষয়ক ইন্ডিয়া পালস অ্যান্ড গ্রেইনস অ্যাসোসিয়েশন (আইপিজিএ) ও ওভারসিস অ্যাগ্রো ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ সময় মিয়ানমারে বিনিয়োগ বাড়াতে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের প্রতিও আহ্বান জানান তারা।
মিয়ানমার জান্তার সঙ্গে ভারতের এ দহরম-মহরম সম্পর্ক ২০২১ সালের শুরু থেকেই। পহেলা ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থান নিয়ে বিশ্ব যখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সমালোচনা ও নিন্দায় মুখর, ঠিক তখন ওই সামরিক অভ্যুত্থান নিয়ে তেমন কিছুই বলেনি ভারত।
অভ্যুত্থানের পরই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হয়। কিন্তু এসব বিক্ষোভের ওপর রীতিমতো সাড়াশি ও রক্তক্ষয়ী অভিযান শুরু করে জান্তার সেনারা। এর মধ্যেই সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ‘আর্মড ফোর্সেস ডে’ উপলক্ষে বিশাল কুচকাওয়াজের আয়োজন করে জান্তা সরকার। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ ওই কুচকাওয়াজ বয়কট করলেও রাশিয়া ও চীনের মতো মুষ্টিমেয় যে কয়টি দেশ তাতে অংশ নিয়েছিল তার মধ্যে ভারতও ছিল।
আরও পড়ুন: রাশিয়া থেকে আরও দুই যুদ্ধবিমান পেল মিয়ানমার
এরপর মিয়ানমার জান্তার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণের কয়েক মাস পরই ইন্ডিয়ান নেভি আয়োজিত গোয়া মেরিটাইম কনক্লেভ ২০২১-তে জান্তার নৌবাহিনীর প্রধান মো অংকে আমন্ত্রণ জানায় নয়াদিল্লি। অবশ্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্পর্ক অভ্যুত্থানেরও অনেক আগের।
বর্তমানে মিয়ানমার বেশ কিছু সেনাকে নিজ দেশে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ভারত। এছাড়া জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং প্রায়ই নয়াদিল্লি সফর করেন। শুধু তাই নয়, ২০২০ সালে মিয়ানমার তার প্রথম সাবমেরিনটি পেয়েছে ভারত থেকেই।
কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো যখন মিয়ানমার জান্তার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনমন ঘটিয়েছে, তখন দেশটির সঙ্গে নেপিদোর সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে নয়াদিল্লি।
চলতি বছরের এপ্রিলেই জান্তা প্রধান হ্লাইংয়ের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন মিয়ানমারে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় কুমার। তবে মিন অং হ্লাইংয়ের সরকারকে সমর্থনের জন্য চীন ও রাশিয়া প্রায়ই গণমাধ্যমের নেতিবাচক শিরোণাম হলেও একই জান্তার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে গণমাধ্যমে তেমন আলোচনা নেই বললেই চলে।
]]>




