বিনোদন

মহাকাশে পশ্চিমাদের টেক্কা দেবে চীনের ‘স্বর্গের প্রাসাদ’

<![CDATA[

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই অবিস্মরণীয় এক কীর্তি গড়েন জার্মান বিজ্ঞানীরা। ১৯৪৪ সালে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে মনুষ্যনির্মিত কোনো বস্তু। তৎকালীন নাৎসি জার্মানির বিজ্ঞানীদের নির্মিত ভি টু রকেটকেই পৃথিবীর প্রথম মহাকাশ যান বা স্পেসক্রাফট হিসেবে ধরা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে মহাকাশ জয়ের প্রতিযোগিতা শুরু হলে তাতে সামিল হয় চীনও। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের থেকে মহাকাশ প্রযুক্তিতে অনেক পিছিয়ে ছিল চীন। ফলে ১৯৭০ সালে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে পারলেও দীর্ঘদিন এই খাতে খুব একটা উন্নতি করতে পারেনি বেইজিং।

তবে নব্বই দশকে চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পালে হাওয়া দেয় তাদের মহাকাশ যাত্রার মিশনে। ২০০৩ সালে মহাকাশে যাত্রা করে চীনের মনুষ্যবাহী মহাকাশ যান শেনঝু ফাইভ। এরপর থেকেই অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে চীনের মহাকাশ মিশন, যা তাদের শামিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো বিশ্বের মহাকাশ পরাশক্তির কাতারে।

বর্তমানে মহাকাশে সম্পূর্ণ নিজেদের তৈরি স্পেস স্টেশন তিয়ানগং নির্মাণ করছে চীন। চীনা ভাষায় যার অর্থ ‘স্বর্গের প্রাসাদ।’  আর এই মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের জন্য নিয়মিতই পৃথিবী থেকে রসদ নিয়ে মহাকাশে যাওয়া আসা করছে চীনের মনুষ্য ও রসদবাহী মহাকাশ যান। যার সর্বশেষ সংযোজন তিয়ানঝু ফাইভ মহাকাশ যানটি।

কী আছে তিয়ানঝু ফাইভে?

শনিবার (১২ নভেম্বর) তিয়ানঝু ফাইভকে সাফল্যের সঙ্গে উৎক্ষেপণ করেছে চীন। তিয়ানঝু ফাইভকে বহন করে চীনের তৈরি শক্তিশালী লং মার্চ ওয়াই সিক্স রকেট। দক্ষিণাঞ্চলীয় হাইনান প্রদেশে অবস্থিত ওয়েনচ্যাং উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩ মিনিটে মহাকাশের দিকে যাত্রা শুরু করে তিয়ানঝু ফাইভ। উৎক্ষেপণের দশ মিনিটের মধ্যে নিজের নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছে যায় তিয়ানঝু। এর পরপরই এতে থাকা সৌর বিদ্যুতের প্যানেলগুলো খুলে যায়।

আরও পড়ুন: ঐতিহাসিক উচ্চতায় জার্মানির মূল্যস্ফীতি

বর্তমানে স্পেসস্টেশন তিয়ানগংয়ে সংযুক্ত হওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে মহাকাশ যানটি। চলতি মাসের শেষেই তিন চীনা নভোচারীকে নিয়ে তিয়ানগং স্পেস স্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা করবে চীনের অপর মহাকাশ যান শেনঝু ফিফটিন। মূলত এই নভোচারীদের প্রয়োজনীয় রসদ ও সেখানে পরিচালিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও জ্বালানি পাঠানো হয়েছে তিয়ানঝু ফাইভে। সেখানে এই নভোচারীদের ছয় মাসের জীবনধারণের রসদ রয়েছে। এ ছাড়াও সেখানে রয়েছে মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী।

তিয়ানঝু ফাইভে ৮টি স্টোরেজ ট্যাংক আছে। এর আগের মডেলের মহাকাশযানে ছিল ৪টি স্টোরেজ ট্যাংক। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো মহাকাশযানটি বহন করছে বিশেষ ধরনের ফুয়েল সেল। মহাকাশের পরিবেশে সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য সেখানে এসব ফুয়েল সেল পাঠানো হচ্ছে।

চীনের ‘স্বর্গের প্রাসাদ’ তিয়ানগং

মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে চীন বিশ্বের তৃতীয় দেশ যারা মহাকাশে নভোচারী পাঠিয়েছে এবং একই সঙ্গে মহাকাশে স্পেস স্টেশন বা মহাকাশ কেন্দ্র তৈরি করছে। এর আগে যে দুই দেশ এই দুটি উদ্যোগ নিয়েছিল তারা হলো, সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

গত বছর চীন তাদের মহাকাশ কেন্দ্র তিয়ানগংয়ের প্রথম মডিউল কক্ষপথে স্থাপন করেছিল। চীনা ভাষায় তিয়ানগং নামের অর্থ ‘স্বর্গের প্রাসাদ।’ তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশন নির্মাণ নিয়ে চীনের পরিকল্পনা খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। চীন আশা করছে, বর্তমানে যে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন আছে, তাদের মহাকাশ কেন্দ্রটি ভবিষ্যতে তার জায়গা নেবে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র আইএসএসকে চীনা নভোচারীদের ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। কারণ এই মহাকাশ কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের নাসা। আর নাসা কোনো তথ্য চীনের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবে না, এমন নিষেধাজ্ঞা সংবলিত আইন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। তবে আইএসএস-এর মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। আগামী ২০৩১ সালে এর মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে একে অকার্যকর করে কক্ষপথ থেকে সরিয়ে নেয়া হবে।

আরও পড়ুন:  দশ বছরে দ্বিগুণ জিডিপির সম্ভাবনা দেখছে ভারত

চীনের পরিকল্পনা তিয়ানগংয়ে আরও নতুন অংশ বা মডিউল যোগ করা। আগামী বছর চীন শুনতিয়ান নামের একটি মহাকাশ টেলিস্কোপ পাঠাবে। এটি মহাকাশ কেন্দ্র তিয়ানগংয়ের কাছাকাছি উড়বে পাশাপাশি কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ এবং কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহের কাজও করবে। তিয়ানগং-এ থাকবে নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, কেন্দ্র চালনার প্রযুক্তি, জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম এবং থাকার ঘর।

তিয়ানগং থেকে চীন পৃথিবী পৃষ্ঠের কাছ থেকে গ্রহাণুর বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করতে চায়। পাশাপাশি আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বেইজিং। এ ছাড়া মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহ থেকে নমুনা আনার জন্য অনুসন্ধানী মহাকাশ যান পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

প্রতিযোগী বাড়ছে মহাকাশে

এদিকে চীন মহাকাশে তার ভূমিকা যখন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করতে উদ্যোগী হয়েছে, তখন মহাকাশে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে পিছিয়ে নেই অন্যান্য দেশগুলোও। ২০২৫ সাল থেকে নভোচারীদের আবার চাঁদে পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করতে চায় যুক্তরাষ্ট্রের নাসা। সে লক্ষ্যে কেনেডি স্পেস সেন্টারে নতুন সুবিশাল এসএলএস রকেট স্থাপন করেছে তারা। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের নিজস্ব চন্দ্রাভিযানের কার্যক্রম নিয়ে কাজ করছে।

ইতোমধ্যেই ভারত চাঁদে তাদের বড় দ্বিতীয় অভিযান চালিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতও তাদের নিজস্ব একটি মহাকাশ কেন্দ্র তৈরি করতে আগ্রহী। এ ছাড়া চাঁদে অভিযান নিয়ে নাসার সঙ্গে কাজ করছে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা। তারাও চাঁদে স্যাটেলাইটের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যা নভোচারীদের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করে দেবে।
 

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button
error: Content is protected !!