বাংলাদেশ

মার্কিন মানবাধিকার রাজনীতি ও ফয়সাল হত্যা

<![CDATA[

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সৈয়দ ফয়সাল আরিফ নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যে-ই দেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার নিয়ে সরব থাকে, সাজা হিসেবে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারি করে, সেই দেশেই পুলিশের গুলিতে নিরীহ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন; অথচ তার কোনো বিচার হচ্ছে না।

সময় সংবাদের সঙ্গে আলাপে সেই প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিক ও কলাম লেখক অজয় দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর পুলিশের হাতে গড়ে এক হাজার মানুষ নিহত হন। এটি আমার না, ওয়াশিংটন পোস্টের খবর। কাজেই নিজের দেশেরই যখন এমন অবস্থা, তখন তারা কীভাবে বলবে যে বাংলাদেশে মানবাধিকার নেই।’

তার মতে, বাংলাদেশে পুলিশের হাতে নিপীড়নের সংখ্যা এত সংখ্যক কেন, এর ধারেকাছেও নেই। এক-দুজন হলেই সেটা একটি বড় আলোড়ন ওঠে। কিন্তু প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার মানুষ বন্দুক হামলার শিকার হন।

গেল ৪ ডিসেম্বর রাত সোয়া ১১টায় ক্যামব্রিজ শহরের চেস্টনাট স্ট্রিটে ফয়সাল আরিফকে গুলি করে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মিডলসেক্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ম্যারিয়েন রায়ান বলেন, পুলিশের হটলাইনে ফোনটা করেছিলেন ক্যামব্রিজ পোর্টের এক বাসিন্দা। তিনি বলেছিলেন, এক তরুণ খালি গায়ে ঘরের জানালা দিয়ে লাফিয়ে রাস্তায় নেমেছে, তার হাতে বড় আকারের একটি ছুরি রয়েছে। তরুণটি নিজেকে ছুরিকাঘাতে আহত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ফয়সাল আরিফের হাতে কোনো ছুরি ছিল না।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি ছাত্র নিহত হওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন: তথ্যমন্ত্রী

অজয় দাশগুপ্ত বলেন, ‘সে (ফয়সাল) যদি ছুরি নিয়ে পুলিশকে তাড়াও করে, তার মানে তো তাকে হত্যা করা যাবে না। তাকে গ্রেফতার করা যেত। তার হাতে ছুরি থাকলেও মার্কিন পুলিশ, যারা অনেক সুপ্রশিক্ষিত, বিশালদেহী ও স্বাস্থ্যবান, তারা তাকে কাবু করতে পারবে না? আর ফয়সাল তো সুপ্রশিক্ষিত কেউ না। তাকে কেন হত্যা করতে হবে? এখন আমরা আশা করব, তার পরিবার যাতে ন্যায়বিচার পায় ও ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়।’

ক্যামব্রিজের পুলিশ কমিশনার ক্রিস্টিন ইলো বলেন, যে কোনো মৃত্যুই বেদনাদায়ক। ফয়সাল আরিফের মৃত্যুকেও সহজভাবে নিচ্ছি না। সরেজমিনে তদন্ত চলছে। যদি অন্যায়ভাবে গুলি চালানো হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট অফিসারের বিরুদ্ধে অবশ্যই যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট অফিসারকে এরইমধ্যে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে সৈয়দ ফয়সাল আরিফের নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ঢাকায় মানববন্ধন হয়েছে। বিক্ষোভ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ক্যামব্রিজ শহরেও। এ হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না প্রবাসীরা। ফয়সালের মৃত্যুকে ‘পুলিশি হত্যাকাণ্ড’ বলে দাবি করেছেন তারা।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় ঢাকায় মানববন্ধন

নিষ্পাপ ফয়সাল আরিফের বুকে পুলিশের গুলি কেন; সেই প্রশ্নের জবাব নেই কমিউনিটি নেতা ইকবাল ইউসুফের। তিনি বলেন, এ শহরটিতে সবসময় শান্তিপ্রিয় মানুষ বাস করেন। এখানে কখনো দাঙ্গা হয়নি। তাহলে তাকে এভাবে গুলি করা হবে কেন?

সাত বছর আগে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ফয়সাল আরিফ। ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্টের বোস্টন ক্যাম্পাসে লেখাপড়া করছিলেন এ তরুণ।

ফয়সাল আরিফ খুবই মেধাবী ছিল জানিয়ে তার বাবা মুজিবউল্লাহ বলেন, আশা করেছিলাম, সে প্রকৌশলী হবে। কিন্তু সব আশা শেষ হয়ে গেল।

বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র যেসব ভূমিকা রাখছে, তা সব সময়ই বিতর্কিত। বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবছর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মানবাধিকারের অন্যতম অংশ ভোটাধিকার এবং স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথাও তাতে থাকে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যেভাবে বিতর্কিত হয়েছে, তাতে তারা যে অন্য দেশগুলোর সমালোচনা করে, তা-ও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

অজয় দাশগুপ্ত বলেন, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্রের অনুমোদন নিতে তেমন প্রতিবন্ধকতা নেই, সেহেতু সেখানে লোকজন সহজেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। সম্প্রতি ছয় বছরের একটি শিশু এক শিক্ষককে গুলি করে হত্যা করেছে। দেশটিতে পুলিশের হাতে নিহতদের ৯৮ দশমিক ১ শতাংশের কোনো বিচার হয় না। এ জন্য কাউকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না। যতলোক গড়ে মারা যাচ্ছেন, এর বাইরে খুন-জখম, হাজার হাজার লোক গুপ্তহত্যার শিকার হচ্ছেন। এর কোনো বিচার নেই, একটা কথা কেবল বলে দেয়া হয়, আত্মরক্ষার্থে গুলি করেছে।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নিহত

কিন্তু অন্য দেশগুলোর বেলায় তা মানতে নারাজ বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তি দেশটি। সেই বিষয়টি সামনে রেখে এই সাংবাদিক বলেন, বাংলাদেশে তারা যখন পুলিশ কিংবা র‍্যাব সম্পর্কে বলে, তখন আত্মরক্ষার্থে গুলি করা হচ্ছে, বা সন্ত্রাস দমনের স্বার্থে আমাদের কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়, এমন কথা তখন তারা মেনে নেয় না। আমাদের প্রশ্ন; তাহলে তোমাদের দেশে এত বেশি হত্যাকাণ্ড হচ্ছে কেন? আমাদের তো পুলিশের হাতে এতো বেশি হয় না।

‘আবার এখানে (বাংলাদেশে) যদি পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কোনো সদস্য অন্যায় করেন, সেটা অবশ্যই দেখা (বিচার হওয়া) উচিত, এ নিয়ে কোনো সংশয় থাকা উচিত না। কিন্তু সেটা তো আমাদের (অভ্যন্তরীণ) ব্যাপার। আমাদের রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন সবার এ নিয়ে চিন্তা করা উচিত, যাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড না ঘটে কিংবা বিচার যাতে ন্যায়সঙ্গত হয়,’ যোগ করেন অজয় দাশগুপ্ত।

তিনি বলেন, কিন্তু আমাদের দেশের যখন যুদ্ধাপরাধের বিচার চলে, তখন তো তারা আদালতে গিয়ে হাজির হতে চেয়েছিল। বিচার ঠিকমতো হচ্ছে কি-না; সেই খোঁজ নেয়। আমাদের এখানে ১৯৭১ সালে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে। তারা (পাকিস্তানি বাহিনী) গোপনে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেনি। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ রাত থেকে হত্যাকাণ্ড শুরু করে। তারা যাকে সামনে পেয়েছে, মেরে ফেলেছে।

আমেরিকার অস্ত্র দিয়েই এসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে জানিয়ে অজয় দাশগুপ্ত বলেন, ইয়াহিয়া খানকে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র ও অর্থ দিয়েছে। জাতিসংঘের সমর্থন দিয়েছে। আমেরিকার ভেতর থেকে নিন্দার দাবি উঠলে বলা হয়েছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়, আমাদের কিছু বলার নেই।

‘এখন আমাদের বক্তব্য, বাংলাদেশে যখন অন্যায় কিছু ঘটে, তারা বললে আমরা তা মেনে নিই। আমরা সেটার তদন্ত করি ও জবাব দেই। কিন্তু অনেক সময় বিষয়টি এমনভাবে বলে যে বাংলাদেশে কী ঘটছে, না-ঘটছে, সবকিছুতে বলার অধিকার বা কর্তৃত্ব তাদের আছে। কাজেই আমরা দাবি করব, যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের বাংলাদেশি বংশোদ্ভুতদের ওপর যাতে অন্যায় কিছু না ঘটে। যদিও ঘটে থাকে, তাহলে যাতে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়,’ বলেন এই সাংবাদিক।

তিনি জানান, কয়েকদিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বিএনপির এক কর্মীর বাড়িতে গেছেন। তাহলে আমাদের একজন বাংলাদেশি নাগরিক যখন যুক্তরাষ্ট্রে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তখন সেটা কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়? আমরা বলব, যারা যেমন আমাদের ক্ষেত্রে বলে, তেমনি তাদের দেশে যখন আমাদের নাগরিকেরা পুলিশি নিপীড়ন, বর্ণবাদী হামলার শিকার হন, তাদের প্রতিও যাতে সুবিচার করা হয়।

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!