মেসির ক্যারিয়ারে সফলতা ও আক্ষেপের গল্প
<![CDATA[
১৯৮৭ সালের ২৪ জুনে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্মগ্রহণ করেন লিওনেল মেসি। মাঠে তার ফুটবল নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে দিয়েছেন একাধিক নাম। ফুটবলের ক্ষুদে জাদুকর, ভিন গ্রহের কেউ বা ফুটবলের রাজপুত্র যে নামেই তাকে ডাকুক না কেন, কোনোটা বেমানান নয় মেসির পাশে। তার ক্যারিয়ার জুড়ে রয়েছে হাজারো রেকর্ড। এক কথায়, মেসি ফুটবল কে যা দিয়েছে তা কখনও মুছে ফেলার মতো নয়।
অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারে অসংখ্য সাফল্যের পালক যুক্ত হয়েছে লিওনেল মেসির মুকুটে। ফুটবল ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটাই বার্সেলোনায় কাটিয়েছেন লিওনেল মেসি। কাতালুনিয়ায় আর্জেন্টাইন সুপারস্টারের জনপ্রিয়তা তাই আকাশচুম্বী। ২০২০ সালের এক জরিপে দেখা যায়, বার্সেলোনার হাজার হাজার শিশুর নাম রাখা হয় লিও।
কাতালান ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিস্টিক্স ২০১৯ সালেই খোঁজ পেয়েছে লিও নামের ৫০০ শিশুর। মোট জন্ম নেয়া শিশুর মধ্যে ৮.২২ ভাগ ছেলে শিশুর নামই মেসির নামের প্রথমাংশের সঙ্গে মিল রেখে। আর আর্জেন্টিনা তো আরও এগিয়ে। লিওনেল মেসির নাম এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত সেখানে এই নাম রাখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে এত জনপ্রিয়তা এবং অর্জনের মাঝেও তার সবচেয়ে বড় আক্ষেপের বিষয়, বিশ্বকাপ না জিততে পারা। কিন্তু এ নিয়ে তার মধ্যে কোনো হতাশা কাজ করে না। বরং সৃষ্টিকর্তা যা দিয়েছেন তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চান তিনি।
আরও পড়ুন: ৩৬ বছরের আক্ষেপ ঘোচাতে কাতারে পা রাখল আর্জেন্টিনা
আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার সবচেয়ে বড় অর্জন বলতে ২০০৫ সালে জেতা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, ২০০৮ অলিম্পিকে স্বর্ণপদক, ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় এবং ২০২২ সালে ফিনালিসিমার শিরোপা জয়। আর সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত অর্জন বর্ষসেরা হয়ে সাত বার ব্যালন ডি’অর জয়। জাতীয় দলের জার্সিতে কিছুটা বিবর্ণ হলেও মেসি ক্লাব ফুটবলে এক জীবন্ত কিংবদন্তি। ক্লাব পর্যায়ে সম্ভাব্য সবই জেতা হয়ে গেছে তার। কাতালানদের হয়ে ক্লাব রেকর্ড ৩৪টি শিরোপা জেতার স্বাদ পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে লা লিগায় ১০টি আর ৪টি আছে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা। তার ক্লাব ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসি কতটা সফল আর কতটাই বা ব্যর্থ, ধাপে ধাপে তুলে ধরা যাক সে গল্প।
মেসির প্রথম বিশ্বকাপ
২০০৫-০৬ মৌসুমে ইনজুরির কারণে ২০০৬ ফিফা বিশ্বকাপে মেসির খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবুও তিনি দলে ডাক পান। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম খেলায় তিনি সাইড বেঞ্চে বসেছিলেন। পরের খেলায় সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে খেলার ৭৪তম মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন এবং ৭৮তম মিনিটে হের্নান ক্রেসপোর একটি গোলে সহায়তা করেন। খেলার ৮৮তম মিনিটে তিনি একটি গোল করেন। এতে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ ও ইতিহাসের ষষ্ঠ কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মেসির প্রথম ফাইনাল
অভিষেকের দুই বছর পরই ক্যারিয়ারের প্রথম ফাইনাল খেলার সুযোগ আসে মেসির ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকায়। ওই আসরে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রতিটি ম্যাচ খেলেন তিনি। ৬ ম্যাচে দুটি গোল তার। কিন্তু ফাইনালে পুরো ৯০ মিনিটে খেলেও কোনো গোল পাননি তিনি। ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনার হয়ে ১০ নম্বর জার্সিতে মেসি
২০১০ বিশ্বকাপে মেসি ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামেন। এই প্রথম বড় কোনো প্রতিযোগিতায় ১০ নম্বর জার্সি গায়ে জড়ান মেসি। বিশ্বকাপের প্রথম খেলায় নাইজেরিয়ার বিপক্ষে তিনি গোল করার অনেক সুযোগ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তার সব কয়টি প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন নাইজেরিয়ান গোলরক্ষক ভিনসেন্ট এনইয়েমা। পরের খেলায় কোরিয়া রিপাবলিকের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ৪-১ ব্যবধানে জয়লাভ করে। তার সহায়তায় গঞ্জালো হিগুয়েইন খেলায় হ্যাটট্রিক করেন। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার তৃতীয় ও গ্রুপ পর্বের শেষ খেলায় গ্রিসের বিপক্ষে মেসি অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামেন। খেলায় আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। কোনো গোল না করলেও এই জয়ে তার বড় ভূমিকা ছিল। ফলে তাকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত করা হয়। পরবর্তীতে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ৪-০ ব্যবধানে হেরে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়। প্রতিযোগিতার গোল্ডেন বল পুরস্কারের জন্য ১০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় মেসি জায়গা পান। ফিফার টেকনিক্যাল গবেষণা দল তার সক্ষমতা সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘দলের জন্য সৃজনশীলতা, ড্রিবলিং, শুটিং, পাসিং, অসাধারণ গতি- সব বিভাগেই মেসি দক্ষ ও দর্শনীয়।’
২০১১ সালের কোপা আমেরিকায় মেসির ভূমিকা
২০১১ কোপা আমেরিকায় মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে কোনো গোল করতে না পারলেও তিনটি গোলে সহায়তা করেন। ১ জুলাই বলিভিয়ার বিপক্ষে প্রথম খেলাটি ১-১ সমতায় শেষ হয়। তাকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত করা হয়। কলম্বিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় খেলাটি গোলশূন্য ড্র হয়। তৃতীয় খেলায় কোস্টারিকার বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ৩-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। এই খেলাতেও তাকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত করা হয়। কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে ৫-৪ ব্যবধানে হেরে আর্জেন্টিনাকে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিতে হয়।
কোপা আমেরিকার ফাইনাল হেরে অবসরের ঘোষণা
কোপা আমেরিকার শতবর্ষপূর্তির আয়োজন ২০১৫ সালে। এবারও ফাইনালে আর্জেন্টিনা। দুর্দান্ত খেলেন লিওনেল মেসি। সেমিফাইনাল পর্যন্ত করেন ৫ গোল ও চার অ্যাসিস্ট। কিন্তু ফাইনালে আবারও ব্যর্থ হন। এবারও প্রতিপক্ব ওই চিলি। ১২০ মিনিট খেলে কোনো গোল করতে পারেনি তিনি ও তার সতীর্থরা। এবার তো পেনাল্টি শুটআউটেও গোল করতে ব্যর্থ হন এবং টানা তিন ফাইনাল হারের কষ্ট থেকে তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। কিন্তু পরে পুনরায় বিবেচনা করে আবার ফুটবলে ফিরে আসেন।
২০১৪ বিশ্বকাপ শিরোপার জয়ের কাছাকাছি গিয়েও স্বপ্নভঙ্গ
২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলে মেসি অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৫ জুন গ্রুপ পর্বের প্রথম খেলায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-১ গোলে জয় পায় আরজেন্টিনা। খেলার ৬৫তম মিনিটে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় খেলায় ইরানের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের শেষের দিকে যোগ করা অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার পক্ষে একমাত্র জয়সূচক গোল করেন তিসনি। এভাবে ঐ বিশ্বকাপের সকল পর্ব পেরিয়ে ফাইনালে পৌঁছায় মেসির দল। ফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় জার্মানির। ৯০ মিনিট শেষে খেলাটি অমীমাংসিত থাকলে ৩০ মিনিটের অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়। খেলার শেষের দিকে মারিও গোটজের করা একমাত্র গোলে জয় পায় জার্মানি। বিশ্বকাপ না জিতলেও মেসিকে ২০১৪ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত করা হয়।
আরও একবার ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গ
২০১৬ সালের কোপা আমেরিকায় আবারও ফাইনাল খেলার সুযোগ আসে মেসির দল আর্জেন্টিনার। কোপা আমেরিকায় সেবার ৬ ম্যাচে তার ১ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট ছিল। এই আসরের ফাইনালেও তিনি ১২০ মিনিট খেলেন। কোনো গোল করতে পারেন নি। ব্যর্থ হন চিলির কাছে। শিরোপার খুব কাছ থেকে ফিরে আসতে হয় পরাজয় নিয়ে।
পর পর দুটি বৈশ্বিক আসরে ফের ব্যর্থতার গল্প
২০১৮ বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনা বিদায় নেয় রাউন্ড অব সিক্সটিন থেকে। আর ২০১৯ কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা বিদায় নেয় সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে হেরে। গোল করতে ব্যর্থ হন মেসি।
আলবিসিলেস্তেদের হয়ে প্রথম বড় শিরোপা জয়
২০২১ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছর পর কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। এর মধ্য দিয়ে দেশের হয়ে প্রথম শিরোপা জেতেন লিওনেল মেসিও। রিওডি জেনিরোর বিখ্যাত মারাকানায় ফাইনালে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারায় আলবিসেলেস্তে শিবির। ১৯৯৩ সালের পর প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতে আর্জেন্টিনা। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে উজ্জীবিত করেন মেসি।
একইসঙ্গে ২০২২ সালের ফিনালিসিমার শিরোপাও নিজেদের করে নেয় মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করে ইউরোর শিরোপাধারী ইতালিকে।
আরও পড়ুন: ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনাল খেলার স্বপ্ন রোনালদোর
সাত বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী ‘মেসির’ জন্য রয়েছে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি ভিন্ন রেকর্ডেরও সুযোগ। বিশ্বকাপে শুধু আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের মধ্যে গোলের ক্ষেত্রে অ্যাসিস্টের দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছেন ম্যারাডোনা। ৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। তার মধ্যে ৫টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে। মেসি এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে ৫টি অ্যাসিস্ট করেছেন। অর্থাৎ, এই বিশ্বকাপে চারটি অ্যাসিস্ট করলেই ম্যারাডোনাকে টপকে যাবেন মেসি।
এছাড়াও ২০২২ বিশ্বকাপে ৩টি গোল করলেই ম্যারাডোনাকে টপকে যাবেন মেসি। হবেন বিশ্বকাপে সব থেকে বেশি গোল করা আর্জেন্টাইনদের মধ্যে সেরা খেলোয়াড়। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগটা কাজে লাগাতে পারলে মেসি হয়ে যাবেন ফুটবল ইতিহাসে সেরাদের সেরা।
লেখক: মাজহারুল ইসলাম শামীম। শিক্ষার্থী, ফেনী সরকারি কলেজ।
]]>




