রামু ট্রাজেডির ১০ বছর: এখনও সন্ধান মেলেনি উত্তম বড়ুয়ার
<![CDATA[
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের রামুতে আলোচিত সাম্প্রদায়িক সংঘাত হয়েছিল। যেদিন উত্তম বড়ুয়া নামের এক যুবকের ফেসবুক আইডিতে কোরআন শরীফ অবমাননাকর ছবি পোস্ট করার অভিযোগ তুলে উস্কানিমূলক মিছিল সহকারে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা চালিয়ে বিহারে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এতে কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ১৩টি বৌদ্ধ বিহার এবং ৩০টি বসত বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ঘটনার ১০ বছরে এসেও সেই উত্তম বড়ুয়ার কোন খোঁজ জানেন না তার বাবা ও মা। এমন কি উত্তম বড়ুয়ার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে এখন কোথায় আছেন তার তথ্যও দিতে পারেননি কেউ।
উত্তম বড়ুয়ার বাবা সুদত্ত বড়ুয়া জানান, পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে অর্থ কষ্টে চরম দুরবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। ছেলের সাথে কোনভাবেই এ পর্যন্ত তাদের কোন যোগাযোগ হয়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছেন উত্তম বেঁচে আছেন ঠিক কোন মাধ্যমে উত্তম বেঁচে থাকার তথ্য জেনেছেন তা প্রকাশ করেননি তিনি।
তবে সুদত্ত জানান, তার ছেলে দেশে আছে কি বিদেশ আছে তা জানেন না। প্রধানমন্ত্রী চাইলে ছেলেকে তার কাছে ফিরে আনতে পারেন। মৃত্যুর আগে ছেলেকে দেখতে চান তিনি।
উত্তমের মা মাধু বড়ুয়া জানান, ১০ বছর আগে সংঘটিত ঘটনাটিতে উত্তম কোনভাবেই জড়িত নন। উত্তমকে ফিরে আনা হলে প্রকৃত সত্য জানা যাবে। তার ছেলে ফিরে আনার দাবি মায়ের।
আরও পড়ুন: রামু সহিংসতা: দোষীদের শাস্তির পাশাপাশি সম্প্রীতি চান স্থানীয়রা
রামুর হাইটুপী পাড়া উত্তমের বাবা ও মায়ের সাথে আলাপ হলেও ওখানে পাওয়া যায়নি উত্তমের স্ত্রী রিতা বড়ুয়া ও ১৪ বছরের সন্তান আধিত্র বড়ুয়াকে। সুদত্ত বড়ুয়া ও মাধু বড়ুয়া জানান, তাদের পুত্রবধূ নাতিকে নিয়ে সীমা বিহার সংলগ্ন ভাড়া বাসায় থাকেন। তবে ওখানে গিয়েও পাওয়া যায়নি রিতা বড়ুয়াকে। তিনি কোথায় এ তথ্যও দিতে রাজি নন কেউ।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতের ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে এজাহারভুক্ত ৩৭৫ জন এবং অজ্ঞাত আরও ১৫ থেকে ১৬ হাজার জনকে আসামি করে ১৮টি মামলা করে। পরবর্তীতে এসব মামলায় প্রায় ১ হাজারেরও বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র জমা দেয় পুলিশ। কিন্তু ১০ পার হলেও এখনো পর্যন্ত একটি মামলার বিচার কাজ শেষ হয়নি। এ অবস্থায় বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা।
তারা বলেছেন, এখন বিচারের নামে নিরপরাধ কোন ব্যক্তি হয়রানি হোক তা চান না তারা। তারা চান শান্তি ও সম্প্রীতি।
এ বিষয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা কেতন বড়ুয়া জানান, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে রামুতে মিছিল, মিটিং হয়েছে। অনেকেই চেনা গেছে। কিন্তু মামলার পরবর্তী যে প্রক্রিয়া তাতে অনেক চিহ্নিত ব্যক্তি যেমন বাদ পড়েছে তেমনি নিরপরাধ অনেকেই হয়রানি হতে দেখা গেছে। বৌদ্ধ শান্তির ধর্ম। এখনে সকলেই শান্তি চান।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা বিপুল বড়ুয়াও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনার ১০ বছরে এসে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ ভুলতে বসেছে। পুড়িয়ে দেয়া বিহার নান্দনিকভাবে নির্মিত করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শান্তিতে আছি; সম্প্রীতিতে আছি। এর চেয়ে বেশি পাওয়ার নেই।’
আরও পড়ুন: এক যুগে কোকো ট্রাজেডি
কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের আবাসিক ভিক্ষুক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, আলোচিত এ হামলার ঘটনায় এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল তা অনেকটা ঘুচিয়েছে। এটা ধারাবাহিক রক্ষা করা জরুরি। বিচারের নামে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা জরুরি। এটা করতে গিয়ে নিরপরাধ কেউ হয়রানিতে শিকার হোক তা কোনভাবেই কাম্য নয়।
কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান, ওই ঘটনায় মামলা হয়েছিল ১৯টি। এরমধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে ১৮টি মামলা করেন। অপর একটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে মামলা করলেও পরবর্তীতে বিবাদীদের সঙ্গে আপোষনামা দিয়ে খালাস করেছেন। বিচারাধীন ১৮টি মামলায় সাক্ষী না পাওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা।
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইন কর্মকর্তা জানান, মামলায় কোনভাবেই সাক্ষীরা আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে রাজী হচ্ছে না। ফলে মামলা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকট হচ্ছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাও সাক্ষ্য দিতে বা হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী হচ্ছে না।
]]>




