খেলা

সারাহ মরে গিয়েও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন

<![CDATA[

কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকগণ জীবনকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে নিরীক্ষণ করেন। কেউ কেউ একে উদোম কসাইখানা, কেউ কেউ মৃত্যু অবধি জুয়ার আসরসহ নানা নেতিবাচক ভূষণে ভূষিত করেন। কিন্তু জীবন সুন্দরেরও উদাহরণ। কেউ কেউ জীবনের সুন্দরকে ফুটিয়ে তোলার জন্য অনন্য দৃষ্টান্তও স্থাপন করেন। এই যেমন গত সপ্তাহেই এমন একটি অসাধারণ সংবাদ পড়লাম আমরা। সারাহ ইসলাম ঐশ্বর্য নামের একটি মেয়ে চমকে দিয়েছে সবাইকে। কীইবা বয়স হয়েছে তার। কৈশোরের ছোঁয়া ভালোভাবে কাটেনি এখনও। বয়স হয়েছিল মাত্র ২০। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেছে দুনিয়া ছেড়ে। যাওয়ার আগে-নিজেকে সে সপে দিয়ে গেছে জীবিতদের জন্য।

২০ বছরের ছোট্ট জীবনে মৃত্যুর পরপরই নিজের অঙ্গ, কিডনি, চোখের কর্নিয়া দান করে গেছে মেয়েটি। যদিও বিষয়টি নিয়ে যেভাবে সাড়া জাগানোর সংবাদ তা উপেক্ষিতই থেকে গেছে। অথচ হিরো আলম, নিপুণ, জায়েদ খানের আলোচনা ঘাটে-মাঠে হয়েছে। ব্যতিক্রমী এবং মানুষের কল্যাণে এতবড় অবদান আমাদের গণমাধ্যমে ঝড় তোলেনি। অদ্ভুত এখানকার রুচিবোধ!

সারাহ আমাদের সামনে একটি বড় উদাহরণ তৈরি করে গেলেন। কারণ অঙ্গ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সংযোজন নিয়ে এখানে তীব্র সংকট রয়েছে। হিসাব করলে দাঁড়ায়, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি।

প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষ কিডনিজনিত অসুখে মারা যায়। কর্নিয়াজনিত সমস্যার কারণে অন্ধ মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। প্রতিবছর ৩০ হাজার মানুষ কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বে ভোগে। অথচ সংখ্যার বিচারে প্রতি বছর যে পরিমাণ মানুষ মারা যায় তার অর্ধেকও যদি অঙ্গ দান করে যান তাহলে এই সমস্যা অনেকাংশে নিরসন সম্ভব।

উন্নত দেশগুলোতে ৯০ শতাংশ কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গ সংগ্রহ করা হয় মরদেহ থেকে। কট্টরপন্থি ইসলামী রাষ্ট্র ইরান, সৌদি আরব, কাতারসহ অন্যান্য ইসলামিক দেশগুলোও এই ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এসব বিচারে এখানটায়ও এখন উদ্যমী হবার সুযোগ আছে।

আরও পড়ুন: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে স্বতন্ত্র কমিশন

সারাহ ২০ বছরের ছোট্ট জীবনে মৃত্যুর পরপরই নিজের অঙ্গ, কিডনি, চোখের কর্নিয়া দান করে গেছেন। চিকিৎসকগণ সেটাকে অন্য শরীরে সুস্থভাবে প্রতিস্থাপন করেছেন। এটা দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়ন চিত্রের একটা দৃষ্টান্তও বটে। তবে বিষয়টি নিয়ে আরো জোরালো সাধুবাদ পাওয়া গেলে কিছুজন হলেও উৎসাহিত হত। টয়লেট থেকে বের হয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হয় এটা শেখাতে এখানে বহু বছর সময় দিতে হয়েছে। কাজেই এই অঙ্গদানের বিষয়টিও যে রাতারাতি হয়ে যাবে সেটা ভাবাও মুশকিল।

সময়ের বিচারে সারাহর অঙ্গদান আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত। মানুষের প্রতিশ্রুতি আসলে এমনি হওয়া উচিত। বেঁচে থাকা অবস্থায় মানুষের জন্য, মরে গেলেও মানুষের জন্য রেখে যাওয়া। বিষয়টি নিয়ে চায়ের দোকানে বেশ জমিয়ে আলাপ চলছিল, যা ইতিবাচক। দেশের রাজনীতিও একসময় চায়ের চুমুকেই ছিল। কিন্তু যেদিন এটা চা থেকে কফিতে উঠেছে সেদিন থেকেই ব্যবসাভাব ঢুকে গেছে। বিদেশি ভাবধারার আহ্বান বেড়ে গেছে। ফলাফল পাবলিক ওপিনিয়নের চেয়ে প্রাইভেট ওপিনিয়িন বা স্বার্থের প্রাধান্য বেশি দেখা দিয়েছে।

দেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুবর্ণ সময় পার করছে। এটা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার কল্যাণে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সময়টায় প্রত্যেক জাতি রাষ্ট্রেই একটা আচরণগত সংকট দেখা যায়। সেটাকে মোকাবিলা করতে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, সামাজিক কাজ করা মানুষজন ভূমিকা রাখেন। কিন্তু এখানে হয়েছে উল্টো। রুচির দুর্ভিক্ষ এখানে এতটাই জোরালো হয়ে উঠেছে যে চুরি করে ক্ষমা প্রার্থনার ভিডিও দিয়ে ভাইরাল হওয়া সিদ্দিক নামের চোরও এখানে অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি বনে যায়। তাকে সম্মান প্রদর্শন শীর্ষক স্কুলের স্কাউট সদস্যরা প্রটোকল দেয়!

আরও পড়ুন: তাবলিগ জামাতের বিভাজন ও বর্তমান বিশ্ব ইজতেমা

চুরি, চোর, নিষ্কর্মা মানুষদের এমন সম্মান আগামীকে কোন পথে উৎসাহিত করবে সেটাও ভাবা জরুরি। মগ, বর্গীরা এদেশ লুট করে গেছে, নিজেদের মাথায়, শরীরে মণিমুক্তা জুড়ে নিয়েছে। ভাড়াটিয়ার মত দেশটাকে শুধু এবং শুধুই ব্যবহার করেছে। বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্ব গুণে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার হিসেবে এদেশ সকল দেশপ্রেমিকের। কাজেই বিকৃত ও লুটেরা মানসিকতার অংশগুলোকে ধরে ধরে চিহ্নিত করতে হবে। এবং ‘সারাহ’র মত কর্মের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করতে হবে।

বিশ বছরের ছোট সারাহ ক্ষণিকের জীবনে নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। মানুষের অনুভূতির সব অংশকে ছুঁয়ে গেছেন। তুলনামূলক দৃষ্টিতে, সারাহ মরে গিয়েও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, পজিটিভ দৃষ্টান্ত। এটাই ভালো থাকা, ভালো রাখার উপাত্ত। পরপারে শান্তিতে থাকার দাওয়া। ভালো থাকবেন সারাহ।

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!