হিটলারের মৃত্যু: আত্মহত্যা নাকি প্রপাগান্ডা?
<![CDATA[
সময়টা ১৯৪৫ সালের পহেলা মে। লন্ডন থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে বিবিসির মনিটরিং ডিপার্টমেন্টে কাজ করছিলেন ২৪ বছর বয়সী কার্ল লেহম্যান। তার কাজ ছিল জার্মানি এবং তাদের সহযোগী দেশগুলোর রেডিও অনুষ্ঠান শোনা, অনুবাদ করা এবং ব্রিটিশ সরকারকে সে সম্পর্কে জানানো। সেদিন হঠাৎ রেডিওতে একটি ঘোষণা আসে যে, নাৎসি নেতা হিটলার মারা গেছেন।
এ ঘোষণায় বিশ্ববাসীর মনে স্বস্তি নেমে এলেও সে সময় হিটলারের মৃত্যু নিয়ে প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছিল। কিন্তু কেন? কেনই-বা তার মৃত্যু পৃথিবীর কাছে দীর্ঘকাল রহস্যে ঘেরা ছিল? যে মানুষটা কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু নিয়ে ছেলেখেলা করেছে, তার মৃত্যুর পর আসলে কী ঘটেছিল?
কী ঘটেছিল ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে?
মূল ঘটনার সূত্রপাত ১৯৪৫ সালের মে মাস নয়, তার আগেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে, অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের শুরুর থেকেই জার্মানি তোপের মুখে ছিল। একের পর এক তাদের সামরিক অভিযান ব্যর্থ হচ্ছিল। সে বছর ২০ এপ্রিল সোভিয়েত গোলন্দাজ বাহিনী বার্লিনে বোমাবর্ষণ শুরু করে এবং ২১ এপ্রিল থেকে বার্লিনে প্রবেশ করতে থাকে। হিটলারের আদেশমতো জার্মান জেনারেল স্টেনোর পাল্টা আক্রমণ করতে ব্যর্থ হতে থাকে। এদিকে হিটলারের মন্ত্রী, সেনাপতি সবাই তাকে বোঝাতে লাগলেন নিরাশ হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। দক্ষিণ জার্মানি, উত্তর ইতালিতে, বোহেমিয়া অঞ্চলে ও অন্যত্র অনেক অক্ষত সৈন্যবাহিনী আছে। কিন্তু হিটলার নিজ সিদ্ধান্তে ছিলেন অনড়। ২৫ তারিখে রুশসৈন্য পুরো বার্লিন ঘিরে ফেলে। তখন আর বার্লিন থেকে বেরোনোর কোনো উপায় রইল না হিটলারের। বাঙ্কারের ভেতর হিটলার পরামর্শ করেন তার অনুচরদের সঙ্গে। কিন্তু কোনো সমাধান খুঁজে পান না।
এরই মধ্যে পূর্ব থেকে এসে রুশ সৈন্য ও পশ্চিম থেকে এসে মার্কিন সৈন্য মধ্য জার্মানিতে হাত মিলিয়েছে। জার্মানিও সে সময় দু-খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর তখনই হিটলার বুঝতে পারেন যে, তার দল হেরে গেছে। এরই মধ্যে ২৮ এপ্রিল ১৯৪৫ সালে ইতালির মিলানে অক্ষশক্তির অন্যতম নেতা বেনিতো মুসোলিনিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হিটলার নিজের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি অনিবার্য বুঝতে পারেন এবং আত্মহত্যার জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন। নয়তো কেনই-বা হিটলার এসএস বাহিনীর চিকিৎসক হাসের কাছে আত্মহত্যার পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইবেন? মজার ব্যাপার হলো, চিকিৎসক হাসও তাকে বন্দুকের গুলি এবং বিষ প্রয়োগ করে আত্মহত্যার কথা বলেন।
হিটলারের জীবনের শেষ মুহূর্ত
দেশ যখন অচল, জার্মানির পতন যখন নিশ্চিত, ঠিক তখন অর্থাৎ ২৯ এপ্রিল মধ্যরাতে দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী ইভা ব্রাউনকে বিয়ে করেন হিটলার। ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল বিকেলে হিটলার মাটির ৫০ ফুট নিচে তার বাঙ্কারের করিডোরে স্ত্রী ইভাকে নিয়ে বের হয়ে আসেন। করিডোরে হিটলারের অতি বিশ্বস্ত কিছু মন্ত্রী, সেক্রেটারি, সেনাপতি, স্টেনো দাঁড়িয়েছিলেন। হিটলার ও ইভা নীরবে একে একে সবার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। তারপর নিতান্ত যে কজনের প্রয়োজন তারা করিডোরে রইলেন, বাদ বাকিদের বিদায় দেয়া হলো। কিন্তু কে জানত, এটাই নেতার সঙ্গে তাদের শেষ দেখা!
এরপর হিটলার ও ইভা খাস কামরায় ঢোকেন। অনুচররা বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর একটি গুলির শব্দ শোনা গেল। সাথে সাথে অনুচররা কামরার ভেতরে ঢুকে দেখতে পান, হিটলার সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আছেন, কিংবা পড়ে আছেনও বলা যেতে পারে। তার খুলি, মুখ এবং যে সোফাটিতে তিনি বসেছিলেন সব রক্তাক্ত। তার মাথায় পিস্তলের গুলির আঘাত। আর কাঁধে ইভার মাথা হেলে পড়েছে। ইভার কাছেও মাটিতে একটি ছোট পিস্তল। কিন্তু তিনি সেটা ব্যবহার করেননি। বিষ পানে আত্মহত্যা করেছেন।
কী হয়েছিল হিটলারের মৃত্যুর পর?
আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন যে, জীবদ্দশায় হিটলারকে ২৫ বারের মতো মারার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাকে প্রতিবারই মারতে ব্যর্থ হয়েছিল প্রতিপক্ষ। যার প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষায় পৃথিবীজুড়ে প্রাণ দিয়েছে প্রায় ৫ কোটি মানুষ। অবশেষে সেই হিটলারের করুণ মৃত্যু ভাবিয়েছে পুরো বিশ্বকে। বদলে দিয়েছে বিশ্ব রাজনীতির ছক। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলা হয়নি, তাহলো হিটলারের মৃত্যুর পর মরদেহ জার্মান সৈন্যরাই বাঙ্কার থেকে বের করে রাইখ চ্যান্সেলরির বাগানে গর্তে ফেলে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে: কেন হিটলারের মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে নাৎসি সেনারা?
হিটলারের মৃত্যুর পর তার মৃত্যুর কারণ জানতে রুশ নেতা জোসেফ স্টালিন একটি ইনভেস্টিগেশন টিম গঠন করেন। ওই টিমের তদন্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে রুশ সৈন্যরা রাইখ চ্যান্সেলরির বাগানের বাঙ্কার থেকে হিটলারের দেহাবশেষ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে হিটলারের ডেন্টিস্ট পোড়া ধ্বংসাবশেষ থেকে তার দাঁত ও মাথার খুলি চিহ্নিত করেন। চিরশত্রুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করতেই স্টালিনের এই তোড়জোড় ছিল। এমনকি তৎকালীন ইউএস প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানও হিটলারের মৃত্যুর খবর জানতেন। অন্যদিকে, স্টালিনও পাবলিকলি হিটলারের মৃত্যুর বিষয়টি অ্যানাউন্স না করে চেপে গেছেন। হিটলারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জেনেও বিশ্ববাসীর কাছে সে সময় কেন লুকানো হয়েছিল–এই প্রশ্নগুলো কিন্তু থেকেই যায়।
হিটলারের মৃত্যু: আত্মহত্যা নাকি প্রপাগান্ডা?
সে সময় হিটলারের মৃত্যু নিয়ে বিশ্বব্যাপী ধীরে ধীরে বহু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলেন, হিটলার ১৯৪৫ সালে মারা যাননি, তিনি জার্মানির পরাজয়ের পর একটি সাবমেরিনে আর্জেন্টিনা পালিয়ে যান। আরেক তত্ত্বে বলা হয়, হিটলার অ্যান্টার্কটিকায় এক গোপন ঘাঁটিতে চলে গিয়েছিলেন। এসব প্রপাগান্ডা ছড়ানোর পেছনে মূল হোতা কিন্তু আর কেউ নন, জোসেফ স্টালিন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, হিটলার মারা গেছেন, কিন্তু তারপরও বিশ্ব রাজনীতিতে চাপ কিংবা অস্থিতিশীলতা চলমান রাখতেই স্টালিন হিটলারের মৃত্যুকে রহস্যময় করে রেখেছিলেন বলে মত বিশ্লেষকদের। এমনকি এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেশ কয়েকবার গোপন বৈঠকও করেছিলেন।
কেন হিটলারের মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল?
কার্ল লেহমান জানান, ১৯৪৫ সালে পহেলা মে রেডিওতেও হিটলারের মৃত্যুর কারণ পরিষ্কারভাবে জানানো হয়নি। বরং পুরো বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যে, নাৎসি নেতা যুদ্ধ করতে করতে মারা গেছেন। ঘোষক কি জানতেন না তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল? মূলত নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতেই হয়তো নাৎসিরা তার মরদেহ পুড়িয়ে ফেলেছিল বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। আর তার মৃত্যুর খবরটিও খুব ধীরে ছড়ানো হয়েছিল।
বিষ খেয়ে নাকি মাথায় গুলি করে হিটলারের মৃত্যু হয়েছিল?
হিটলারের মৃত্যুর প্রায় ছয় দশক পর একদল ফরাসি বিজ্ঞানী বলছেন, তারা নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন যে তিনি ১৯৪৫ সালেই বার্লিনে মারা গিয়েছিলেন। ফরাসি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল রাশিয়ায় সংরক্ষিত হিটলারের দাঁত ও মাথার খুলির অংশ পরীক্ষা করে বলেছে, হিটলার যে বুলেটের আঘাত ও সায়ানাইড পান করার ফলে মারা গিয়েছিলেন–এ ব্যাপারে তারা প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিত। ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ইন্টার্নাল মেডিসিন নামে এক সাময়িকীতে ওই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এই রিসার্চ টিমের প্রধান ফিলিপ শার্লিয়ের দাবি, তাদের এই জরিপের ফলে নাৎসি জার্মানির নেতার ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বহু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নস্যাৎ হয়ে গেছে। গবেষকদের দাবি, ১৯৪৬ সালের পর তারাই প্রথম হিটলারের দেহাবশেষের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন।
১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল বার্লিনে মার্টির নিচের বাঙ্কারের ভেতর হিটলারের মৃত্যু যে স্বাভাবিক নয়, তার প্রমাণ হিসেবে দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ:
প্রথমত, মাথার খুলি: হিটলারের মাথার খুলির একাংশের বাঁদিকে একটি গর্ত দেখা গেছে, যা সম্ভবত বুলেটের আঘাতে সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা গবেষকদের। শুধু তাই নয়, এর চারদিকে কালো দাগও দেখা গেছে।
আরও পড়ুন: যৌনকর্মী থেকে জলদস্যুর সর্দার ‘ঝেং শি’র সাহসী গল্প
দ্বিতীয়ত, তারা এটা নিশ্চিত নন, মাথায় গুলির আগে তিনি সায়ানাইড গ্রহণ করেছিলেন কি না। হিটলারের বাঁধানো দাঁতের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে গবেষকরা নীলাভ আস্তরণ দেখতে পেয়েছেন, যা সম্ভবত ধাতব দাঁতের সঙ্গে সায়ানাইডের সংস্পর্শে হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে। সেটা সাইনাইড গ্রহণের ফলে হয়েছে নাকি পোড়ানোর সময় রাসায়নিক বিক্রিয়ায় হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে পারেননি গবেষকরা।
আরও পড়ুন: দুঃসাহসী ফেলিক্স বমগার্টনার
হিটলারের মৃত্যুর পরপরই জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে আর ইউরোপে ছয় বছরের যুদ্ধের অবসান হয়। যে উগ্রবাদী শাসকের জন্য পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে, শেষমেশ সেই হিটলারের মৃত্যু হলো কাপুরুষের মতো আত্মহননের মাধ্যমে। নিয়তির পরিহাস হয়তো এমনই হয়।
সূত্র: বিবিসি
]]>




