খেলা

অযত্নে পড়ে আছে ‘নীলদর্পণ’ স্রষ্টার জন্মভিটা

<![CDATA[

বাড়িতে নেই কোনো দরজা–জানালা। মাথার ওপর খোলা আকাশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এখানে কোনও দিন ছাদ ছিল। দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে বেরিয়ে এসেছে ইট। সেই ইটেও ধরেছে ক্ষয়। বিষাক্ত সাপের আস্তানা হয়েছে বিশাল এ বাড়িটি। এখন শুধু অস্তিত্ব হারানোর দিন গুনছে। বাড়িটি দীনবন্ধু মিত্রের। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অচেনা দীনবন্ধু মিত্র।

সাবেক পূর্ব বাংলা রেলওয়ের কাঁচরাপাড়া স্টেশনের কয়েক কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে চৌবেড়িয়া গ্রামে দীনবন্ধুর জন্ম ১৮৩০ সালে। যমুনা নামে এক ছোট্ট নদী উত্তর ২৪ পরগণা জেলার গোটা গ্রামটিকে ঘিরে রেখেছে, তাই এর নাম চৌবেড়িয়া। এই গ্রাম নদিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত। বাংলা সাহিত্য, দর্শন, ধর্মশাস্ত্রে নদিয়া জেলার যে বিশেষ গৌরব, তার একটা কারণ দীনবন্ধুও। তার পিতৃদত্ত নাম গন্ধর্বনারায়ণ। ইংরেজ সরকার দীনবন্ধু মিত্রকে ১৮৭১ সালে ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটকের শ্রেষ্ঠ রূপকার ছিলেন দীনবন্ধু মিত্র। হিন্দুসমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রহসন রচনা করেও খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। সমাজের সাধারণ মানুষ সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিই দীনবন্ধু মিত্রের রচনার প্রধান প্রেরণা। চাকরিসূত্রে দেশ-বিদেশ ঘুরে বহুলোকের সঙ্গে দীনবন্ধু মিত্রের পরিচয় হয়। সেই অভিজ্ঞতা তার নাটকের চরিত্র সৃষ্টিতে দীনবন্ধু মিত্র বিশেষভাবে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন: রাজধানীর যেসব এলাকায় যাবেন না মঙ্গলবার

নাট্যকার হিসেবে দীনবন্ধু মিত্রের আবির্ভাবের ফলে সাধারণ রঙ্গালয়ের দ্বারােন্মােচন সহজে সম্ভব হয়ে ওঠে। শুরু হয় বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নতুন অধ্যায়। বাংলা নাটক রাজপ্রাসাদ থেকে মুক্তিলাভ করে চলে আসে খেটে খাওয়া মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। নাট্য ইতিহাসে এই বিপ্লব ঘটে ১৮৭২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৭ তারিখে।

বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটার ন্যাশনাল থিয়েটার নাম ধারণ করে দীনবন্ধু মিত্র বিরচিত বিখ্যাত নাটক ‘নীলদর্পণ’ মঞ্চস্থ করে ওই তারিখে। ‘নীলদর্পণ’ মঞ্চস্থ করে ন্যাশনাল থিয়েটার যে জনসমর্থন ও জনপ্রিয়তা লাভ করে তা বাংলা নাট্যরচনা ও মঞ্চচর্চাকে বিশেষ ও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ও উৎসাহিত করতে সমর্থ হয়।

‘নীলদর্পণ’ বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ নাটক হিসাবে আজও বিবেচিত ও সমাদৃত। নীলকরদের বীভৎস অত্যাচার ও নির্যাতনে লাঞ্ছিত অপমানিত দেশবাসী ও চাষিদের দূরবস্থার এই নাটক তিনি লেখেন ১৮৬০ সালে। চৌবেড়িয়ার এই বাড়িতে বসেই নাটকের বেশ কিছু অংশ লিখেছিলেন তিনি, কিন্তু আজকে তার জন্ম-মৃত্যু দিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায় বাড়ির দেয়াল জুড়ে আগাছা গজিয়েছে। জঙ্গলে ভরে গেছে সম্পূর্ণ বাড়িটি।

এই বাড়িটির পাশেই বসবাস করেন নাট্যকারের পরিবারের চতুর্থ পুরুষরা। ধ্বংসাবশেষের সামনে নাট্যকারের একটি মূর্তি আছে। পর্যটক আসেন বাড়িটি দেখতে। ভগ্নদশা বাড়িতে দেখে তারা ব্যথিত হন। কিন্তু বাড়িটি সংস্কার হয়নি।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ‌বাড়িটির সংস্কার হয় না। জন্ম–মৃত্যুদিনে নাট্যকারের মূর্তিতে মালা পর্যন্ত কেউ দেন না। দীনবন্ধু মিত্র ডাকবিভাগে চাকরি করলেও আজ পর্যন্ত দফতরের পক্ষ থেকে তার স্মৃতিতে কোনও ডাকটিকিট বের করা হয়নি।

আরও পড়ুন: খসে পড়ছে বরগুনা পৌর মার্কেটের পলেস্তারা

দীনবন্ধুর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাটক ও প্রহসন হলো: নবীন তপস্বিনী (১৮৬৩), বিয়ে পাগলা বুড়ো (১৮৬৬), সধবার একাদশী (১৮৬৬), লীলাবতী (১৮৬৭), জামাই বারিক (১৮৭২), কমলে কামিনী (১৮৭৩) প্রভৃতি। সধবার একাদশী ও লীলাবতী উচ্চাঙ্গের সামাজিক নাটক। বিয়ে পাগলা বুড়ো ও জামাই বারিক দুটি প্রহসন। তার রচিত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে দ্বাদশ কবিতা (১৮৭২) ও সুরধুনী কাব্য (২ ভাগ ১৮৭১, ১৮৭৬)।

দীনবন্ধু ছিলেন সমাজকল্যাণনিষ্ঠ শিল্পী। তিনি ছিলেন কৃত্রিমতার বিরোধী এবং সত্যের অনুসারী। জীবন সম্বন্ধে গভীর বাস্তব অভিজ্ঞতার দ্বারা তিনি কল্পনাশক্তির ন্যূনতাকে পূরণ করেছিলেন। তীক্ষ্ণ সমাজদৃষ্টি, জীবন্ত চরিত্রসৃষ্টি এবং মানবিক সহানুভূতি তার সৃষ্টিকে অমর করে রেখেছে। ১৮৭৩ সালের ১ নভেম্বর তার অকাল মৃত্যু ঘটে। আজকের এদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বাংলা নাটকের শ্রেষ্ঠ রূপকার দীনবন্ধু মিত্রকে।

 

 

 

 

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!