বাংলাদেশ

জার্সি বদল: লাইসেন্স খুঁজছে জামায়াত

<![CDATA[

কাজ-কাম নয়, আবারও নাম বদলাতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলাম। নাম পাল্টানোর ইতিহাস নতুন নয় তাদের। নিষিদ্ধ হয়ে আবার ফাঁকফোকরে সিদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতাও ভরপুর। ব্যর্থ হয়নি কখনও। নাম বদল, সঙ্গী বদলে সফল হয়েছে বার বার। সেই ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও কৌশল দৃষ্টে হালে ফের নাম বদলের সন্ধিক্ষণে জামায়াত। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পেতে আবেদন করেছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি-বিডিপি নামে।

এর আগে একই স্টাইলে আবেদন করে রেখেছে আমার বাংলাদেশ এবি পার্টি নামে। ইসলাম-জামায়াত ধরনের ধর্মীয় নাম এড়িয়ে এবি, বিডিপি ইরেজি নামে লুকানো তাদের আদি কৌশল। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে তারা প্রথম সংসদ নির্বাচন করেছিল আরেক ইংরেজি নাম আইডিএল-এর  মোড়কে। পরে আবির্ভূত হয় জামায়াতে ইসলামি, বাংলাদেশ নামে। (একসময় সমালোচনার মুখে পড়ে,পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামের শাখা সংগঠন হওয়ায় বাংলাদেশ নাম পরে সংযোজন হয়েছে। সুযোগ বুঝে তারা পরবর্তী সময় জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশ নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি।)

অন্তহীন চাতুরিতে বিডিপির সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্বীকার করছে না জামায়াত। আবার বিডিপি নেতারাও স্বীকার করছেন না তারা জামায়াত–শিবির সম্পৃক্ত। অথচ ইসিতে বিডিপি নেতাদের নামের যে তালিকা দেয়া হয়েছে তাদের প্রায় সবাই সাবেক শিবির নেতা। এর আগে, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের একটি গ্রুপ নিজেদের সংস্কারপন্থি ও স্বাধীনতার পক্ষের তথা একাত্তরের আগে-পরে জন্ম নেয়া দাবি করে ২০২০ সালের ২ মে ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’-এবি পার্টি নামে একটি দল গঠন করে। তাদেরও নিবন্ধনের জন্য ইসিতে আবেদন করা আছে। 

শুরুতে একে জামায়াতের ভাঙন বলা হলেও তাদের রূপ এবং উদ্দেশ্য প্রকাশ পেতে বেশি সময় লাগেনি। এবি, বিডিপি বা জামায়াত নিবন্ধন পাবে কি, পাবে না-এটি এখনও ভবিষ্যৎ। দলের নাম বদল বা নিষিদ্ধ অবস্থা উৎরাতে এ দলটি অতীতে কয়েক দফায় এমন কৌশলই নিয়েছে। এ চর্চা পাকিস্তান আমলেও করেছে। তা সেই সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর অভিভাবকত্বে ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট লাহোরের ইসলামীয়া পার্কে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নামে জন্মের পর থেকেই। একাত্তরে দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু সরকার জামায়াতকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করে। দলটির নেতারা তখন গা ঢাকা দেন। দেশও ছাড়েন কেউ কেউ। পাকিস্তান চলে যান গোলাম আযমসহ কয়েকজন। এরপর দালাল আইন বাতিল তাদের জন্য হয় আশা জাগানিয়া।

পঁচাত্তর ট্র্যাজেডির পর সাতাত্তরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুবাদে মওকা পেয়ে যায় তারা। ’৭৯-তে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অংশ নেয়  মাওলানা আব্দুর রহিমের ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ-আইডিএল-এর  ছদ্মাবরণে। সংসদীয় নির্বাচনে জয়ী হন ৬ জন। পরে গোলাম আযম বাংলাদেশে ফিরলে ১৯৭৯ সালের মে মাসে গঠন হয় জামায়াতে ইসলামি, বাংলাদেশ। ফাঁকা রাখা হয় আমিরের পদটি। ভারপ্রাপ্ত আমির করা হয় আব্বাস আলী খানকে। আশির দশকে তাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আওয়ামী লীগ-বিএনপির সমান্তরালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। নানা কায়দাকানুনে বৃহৎ দুদল ও ৩ দলীয় জোটকে ফলো করে এগিয়ে যায় অনেক দূর। আওয়ামী লীগের পিছু নিয়ে ছিয়াশিতে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে ১০ আসনে জিতে পুরোদমে মিশে যায় সংসদীয় রাজনীতির স্রোতে।

এরশাদ পতনের পর বিএনপির সঙ্গে নেপথ্য বোঝাপড়ায় একানব্বইর সংসদ নির্বাচনে ১৮ আসনে জিতে অবস্থান আরও পোক্ত করে জামায়াত। সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন জুগিয়ে দুটি সংরক্ষিত আসনও নেয়। এর বছর কয়েকের মাথায় চলে যায় বিএনপির বিরুদ্ধে। কেয়ারটেকার সরকার ফর্মুলা নিয়ে আন্দোলনের মাঠ গরমে নেমে বাড়তি নজর কাড়ে। আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট না হলেও বিএনপির বিরুদ্ধে ত্রিদলীয় লিঁয়াজো কমিটিভুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শরীকানা নেয়। তবে নির্বাচনের মাঠে একা একা সাফল্য পায়নি।  ছিয়ানব্বইর নির্বাচনে সংসদে সিট নেমে আসে মাত্র ৩টিতে। এরপর আওয়ামী লীগ বিরোধী হয়ে আবার মিত্রতা বিএনপির সঙ্গে। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের ছোঁয়া ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের দল বিএনপির পরশের মধ্য দিয়ে জামায়াত নিজেদের আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ২০০১ সালে একেবারে ঘোমটা খুলে বিএনপির জোটসঙ্গী। ১৭ সিটে জিতে দুই মন্ত্রিত্ব নিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায়।

যখন যেদিকে যেতে হয় জামায়াত যুগে যুগে তা-ই করেছে। শয্যাসঙ্গী বদলের মতো মিত্র পাল্টে ফেলে। একেক সময় একেক ভূমিকা তাদের উত্তরাধিকার বৈশিষ্ট্যের মতো। পাকিস্তানপন্থি এই দল এক সময় ভারতের মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে। আবার ছেচল্লিশের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরোধিতা করেছে। বাষট্টিতে আইয়ুব খানের মুসলিম পরিবার আইন অধ্যাদেশের বিরোধিতাও করেছে। দুবছর পর চৌষট্টির ৪ জানুয়ারি জামায়াতের রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। গ্রেফতার করা হয় মওদুদীসহ জামায়াতের ৬০ নেতাকে। এর মধ্যে ছিলেন গোলাম আযমসহ পূর্ব পাকিস্তানের ১৩ জন জামায়াত নেতা। ওই বছর অক্টোবরেই আবার নিষেধাজ্ঞাটি ওঠে যায়। ওই জামায়াতই আইয়ুব খানের সামরিক আইন ঘোষণার সময় পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেয়। পঁয়ষট্টিতে সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জোটেও যায়। এভাবে তারা সময়ে-সময়ে সবদিকে থাকে। আবার বিরোধিতাও করে।

জামায়াতের সেই ধারাবাহিকতা স্বাধীন বাংলাদেশেও। আজ ‘তাহার কাল উহার’  তত্ত্বে  হাল ছাড়ছে না এবারও। হাল বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন হলেও জামায়াত এতে অভ্যস্ত। পেছন থেকে তারা কাদের গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছে এখনও অস্পষ্ট। তবে রাজনীতির বাজারে এ নিয়ে নানা কথা চাউর আছে। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় খুব সাবধানী আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুদলই। জামায়াতের বদন যারা চেনেন, চরিত্র যারা বোঝেন, ইতিহাস যারা জানেন, তাদের কাছে তত অপেক্ষার বিষয় নয় এটি।

তাদের জানা নাম বদলে, সঙ্গী পাল্টিয়ে হেন কাজ নেই যা না করতে পারে জামায়াত-শিবির। ‘বাংলাদেশ’ ও ‘ডেভেলপমেন্ট’ শব্দ দুটিই জামায়াতের জন্য বেমানান। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট নামে বিডিপির মোড়কে জামায়াতকে দিয়ে মৌলবাদ, ধর্মের নামে বিভাজন, রগ কাটা, হত্যা, বাংলাদেশকে অস্বীকার করা, জঙ্গিবাদসহ আর কী ডেভেলপমেন্ট করা সম্ভব- তা বুঝতে রাজনীতি বিশ্লেষক হওয়া জরুরি নয়।

এরা রাজনীতিতে নিষিদ্ধ নয়, নির্বাচনে নিষিদ্ধ। নির্বাচন কমিশন-ইসিতে ফিটনেস সনদ নেই, কিন্তু রাজনীতির ময়দানে রুট পারমিট নিয়ে ঘুরছে। ঢুঁ মারছে নানা দিকে। বিএনপির সঙ্গে আর নেই বলে দাবি করে। আবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে যুগপৎ আন্দোলনের হুঙ্কার দেয়। আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ধারে-কাছেও ঘোরে। মুরব্বি খোঁজে। নয়া নামে ড্রাইভিং হুইলে বসে পুরনো কামের ইজাজত তালাশ করে।

 

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!