শেষ সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম?
<![CDATA[
এডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডি ব্রুইনা, থিবো কর্তোয়া, রোমেলু লুকাকু–সময়ের সেরা এই তারকারা বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের খেলোয়াড়। গত বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়াটাই বেলজিয়ামের এই সোনালি প্রজন্মের সেরা সাফল্য। হ্যাজার্ড, ডি ব্রুইনা, কোর্তোয়া পেরিয়েছেন তিরিশ, লুকাকুও পা দিয়েছেন তিরিশের কোঠায়। ক্লাবের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে একের পর এক শিরোপা জেতা এই তারকাদের আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতার শেষ সুযোগ ধরা হচ্ছে কাতার বিশ্বকাপকে।
বিশ্বকাপে নিয়মিত হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য অর্জন করতে পারেনি বেলজিয়াম। নব্বই দশকের সোনালি প্রজন্ম নিয়ে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়াটাই দীর্ঘদিন তাদের সেরা সাফল্য হয়ে ছিল। রাশিয়া বিশ্বকাপেও হ্যাজার্ড, ডি ব্রুইনাদের সোনালি প্রজন্মের হাত ধরে ফের তৃতীয় হয় তারা। বৈশ্বিক কোনো শিরোপার আক্ষেপ দূর করার জন্য কাতারে আরও একবার সুযোগ পাচ্ছে রেড ডেভিলরা। সোনালি প্রজন্মের তারকারা নিজেদের শেষ বিশ্বকাপে শিরোপাখরা ঘোচাতে বদ্ধপরিকর। ফুটবলপণ্ডিত ও সাবেক খেলোয়াড়দের অনেকেরই বিশ্বকাপে বাজির ঘোড়া বেলজিয়াম।
একনজরে বেলজিয়াম ফুটবল দল
ডাকনাম: রেড ডেভিল
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ১৪বার (১৯৩০, ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪, ১৯৭০, ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২)
সেরা সাফল্য: তৃতীয় স্থান (১৯৮৬, ২০১৮)
বর্তমান র্যাঙ্কিং: ০২
কোচ: রবার্তো মার্তিনেজ
অধিনায়ক: এডেন হ্যাজার্ড
বিশ্বকাপের গ্রুপ: এফ (প্রতিপক্ষ: কানাডা, মরক্কো ও ক্রোয়েশিয়া)
দল হিসেবে বেলজিয়াম দুর্দান্ত। তারকায় ঠাসা দলটায় সোনালি প্রজন্মের তারকাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন নতুন প্রজন্মের দারুণ প্রতিভাবান কয়েকজন তরুণ। দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ রেড ডেভিলদের ডাগআউটে আছেন মাস্টারমাইন্ড ববার্তো মার্তিনেজ। দীর্ঘসময় ধরে দলের দায়িত্বে থাকায় তিনি এ দলের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে রাখেন ভালো ধারণা।
আরও পড়ুন:শেষ ১৬ নিশ্চিতে মাঠে নামছে জাপান-বেলজিয়াম, নামছে ক্রোয়েশিয়াও
বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ফল: বাছাই পর্বে দুর্দান্ত ফল করেই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে রেড ডেভিলরা। উয়েফা বাছাই পর্বে গ্রুপ ‘ই’-তে অপরাজিত থেকে শীর্ষস্থান অর্জন করে বেলজিয়াম। সে গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিল ওয়েলস, চেক রিপাবলিক, এস্তোনিয়া ও বেলারুশ। বাছাই পর্বে ৮ ম্যাচের ৬টিতেই জয় পায় বেলজিয়াম। বাকি দুই ম্যাচে করে ড্র। ২৫ গোল করার বিপরীতে তারা গোল খায় ৬টি।
সাম্প্রতিক ফর্ম: বাছাই পর্বে দুর্দান্ত বেলজিয়ামের সাম্প্রতিক ফর্মটা অবশ্য চিন্তার কারণ হতে পারে কোচের। উয়েফা নেশন্স লিগের ২০২২-২৩ আসরে ফাইনালসে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে রেড ডেভিলরা। লিগ ‘এ’-র গ্রুপ ফোরে নেদারল্যান্ডসের পেছনে থেকে শেষ করেছে তারা। নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও ওয়েলসকে নিয়ে গড়া গ্রুপে ৩ জয়, ১ ড্র ও ২ হারে ১০ পয়েন্ট নিয়ে শেষ করে তারা।
কাতার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি রেড ডেভিলরা। কানাডার বিপক্ষে প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে ব্যর্থ হলেও পেয়েছে কষ্টসাধ্য ১-০ গোলের জয়।
কোচের কৌশল ও পরিকল্পনা: ২০১৬ সাল থেকে বেলজিয়ামের কোচের দায়িত্ব পালন করছেন রবার্তো মার্তিনেজ। উইগান অ্যাথলেটিকের সাবেক কোচ মার্তিনেজের আস্থা ৩-৪-৩ ফর্মেশনে। তিনজন সেন্টার ব্যাকের সামনে দুজন মিডফিল্ডার ও তাদের দুপাশে দুজন উইংব্যাক। সামনে দুজন উইঙ্গারের ও সেন্টার ফরোয়ার্ড। এই কৌশলে উইংব্যাক দুজনের থাকে ওপরে ওঠার স্বাধীনতা। প্রতিপক্ষকে আক্রমণে প্রলুব্ধ করে নিজেদের অর্ধে টেনে এনে হাই প্রেসিংয়ে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত আক্রমণ করাটাই এ কৌশলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে কৌশলে চেঞ্জ এনে থাকেন তিনি।
গত বিশ্বকাপে বেলজিয়ামকে সেমিফাইনালে তোলেন মার্তিনেজ। রাশিয়ায় ব্রাজিলের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে অবশ্য নিজের পছন্দের ফর্মেশন থেকে সরে আসেন তিনি। ব্রাজিলের মধ্যমাঠের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে পাসিং জোন ব্লক করে দেন এবং কাউন্টার অ্যাটকনির্ভর ফুটবল খেলে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন। সেমিফাইনালে অবশ্য দুর্বার ফ্রান্সের সঙ্গে পেরে ওঠেনি রেড ডেভিলরা। শেষ ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় মার্তিনেজের দল।
কোচ হিসেবে নিজ দলের খেলোয়াড়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই স্প্যানিশ বংশদ্ভূত কোচ। মাঠের বাইরেও খেলোয়াড়দের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণে দলের সদস্যদের মধ্যকার সম্পর্ক নিবিড় করতে দারুণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
মূল খেলোয়াড়:
কেভিন ডি ব্রুইনা: বেলজিয়াম দলটি তারকায় ঠাসা। প্রায় সব পজিশনেই আছে গুণগতমানসম্পন্ন খেলোয়াড়। তবে, দলের মূল চালিকাশক্তি ম্যানচেস্টার সিটির অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার কেভিন ডি ব্রুইনা। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সেরা মিডফিল্ডার ডি ব্রুইনা খেলেছেন গত দুই বিশ্বকাপেও। দুই আসর মিলিয়ে ১০ ম্যাচে ২টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।
ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে মৌসুমের পর মৌসুম দারুণ পারফর্ম করে যাচ্ছেন তিনি। অসম্ভব ধারাবাহিক ডি ব্রুইনা গোল করাতে বেশি পছন্দ করলেও গোল করতেও আপত্তি নেই তার। মিডফিল্ডার হয়েও গোলের সামনে তার অ্যাকিউরেসি চোখ কপালে তোলার মতো। তার সম্পর্কে কোচ মার্তিনেজ বলেন, ‘এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে মেধাবী প্লেমেকার হচ্ছে ডে ব্রুইনে। যেভাবে সে ম্যাচ পড়তে পারে, স্থান-কালভেদে অনুবাদ করতে পারে এবং গোলমুখে প্রয়োগ করতে পারে, এককথায় তা দারুণ।’
বিশ্বকাপের আগে ৩১ বছর বয়সী ডি ব্রুইনা আছেন দারুণ ফর্মে। ম্যানসিটির হয়ে এ মৌসুমে ১১ ম্যাচে করেছেন ২ গোল ও ৯ অ্যাসিস্ট।
এডেন হ্যাজার্ড: রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেয়ার পর থেকে অফফর্ম আর ইনজুরিতে ভুগছেন বেলজিয়ামের অধিনায়ক। তারপরও বেলজিয়ামের জার্সিতে নিয়মিত তিনি। গত বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড় হিসেবে সিলভার বল জিতেছিলেন তিনি। রাশিয়ায় বেলজিয়ামকে সেমিফাইনালে তোলার পথে দারুণ পারফর্ম করেন তিনি। ৩ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। কাতারেও হ্যাজার্ড জ্বলে উঠবেন এমনটাই প্রত্যাশা দলের।
আরও পড়ুন:জাপানকে হারিয়ে আশা বাঁচিয়ে রাখল নাভাসের কোস্টারিকা
নজর কাড়তে পারেন যারা:
লিয়ান্দ্রো ট্রসার্ড: ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল ব্রাইটনের হয়ে দারুণ সময় কাটাচ্ছেন ট্রসার্ড। ২৭ বছর বয়সী এই উইঙ্গার দারুণ গতিশীল। ৫.৭ ইঞ্চি উচ্চতার ছোটখাটো গড়নের ট্রসার্ডের দারুণ নৈপুণ্যে ব্রাইটন গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে কাটিয়েছে দারুণ সময়। এ মৌসুমেও ছন্দে আছেন তিনি। দলও প্রিমিয়ার লিগে খেলছে দারুণ। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১২ ম্যাচ খেলে ৭ গোল করেছেন তিনি। বেলজিয়ামের জার্সিতেই ২১ ম্যাচে করেছেন ৭ গোল।
চার্লস ডে কেটেলার: ক্লাব ব্রুগে দারুণ নৈপুণ্য দেখানো ডে কেটলারকে চলতি মৌসুমে দলে ভিড়িয়েছে সিরি ‘আ চ্যাম্পিয়ন এসি মিলান। নতুন ক্লাবের হয়ে নিজেকে এখনও মেলে ধরতে না পারলেও কেটলারের প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও তিনি খেলতে পারেন মধ্যমাঠ বা আক্রমণভাগের যেকোনো জায়গায়। উইঙ্গার হিসেবে বা নম্বর টেন হিসেবে হোল-১৪-তে কিংবা সেকেন্ড স্ট্রাইকার হিসেবেও দারুণ স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারেন তিনি। আঁটোসাঁটো জায়গায় বলের নিয়ন্ত্রণ রেখে সতীর্থদের বলের জোগান দেয়ায় বা সুযোগ খুঁজে নেয়ায় তিনি দারুণ পারদর্শী।
বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স: বিশ্বকাপে বেলজিয়াম মোটামুটি নিয়মিতই। ১৯৩০ সালের প্রথম আসরেই অন্যতম দল ছিল তারা। প্রথম তিন আসরে টানা খেলা দলটি ১৯৫০ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অনুপস্থিত ছিল। পরের আসরে ফের বিশ্বমঞ্চে ফেরে তারা। মাঝখানে ১৬ বছর বিশ্বকাপে অনুপস্থিত থাকার পর ১৯৭০ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে রেড ডেভিলরা। এরপর ১৯৮২-২০০২ আসর পর্যন্ত প্রতিটি আসরেই খেলেছে বেলজিয়াম। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে ওঠে তারা। সেমিফাইনালে অবশ্য ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হেরে যায় তারা। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ হয়ে আসর শেষ করে তারা।
পরের চার আসরে তিনবারই রাউন্ড অব সিক্সটিন থেকে বিদায় নেয় তারা। ২০০৬ ও ২০১০ আসরে কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হলেও ২০১৪ বিশ্বকাপে ফিরে এসেই কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে হ্যাজার্ড-ডি ব্রুইনার বেলজিয়াম। কোয়ার্টার ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হেরে বিদায় নেয় তারা। তবে পরের আসরে রাশিয়ায় ফের সেমিফাইনাল খেলে রেড ডেভিলরা। সেবার ফ্রান্সের বিপক্ষে হেরে আরেকবার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয় তারা। তবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলায় ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা সাফল্য পায় তারা।
]]>




