বিনোদন

রাজনীতিতে মাত্রাহীন মিথ্যাচার!

<![CDATA[

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠনমূলক সাংবাদিকতা বিষয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক উচ্চতর প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকতা শিক্ষাদানে যুক্তদের আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ফ্যাক্ট চেকিং। গণমাধ্যম যে খবর পায় তা ছড়িয়ে দেয়। বলা হয়ে থাকে, নিউজে ভিউজ থাকতে নেই। সংবাদকর্মী কোনো মতামত দিতে পারবে না। যা দেখবে বা শুনবে, সেটাই সংবাদপত্র বা টেলিভিশন-বেতার সেটাই তুলে ধরবে। তবে পত্রিকায় মতামত কলাম থাকে। টেলিভিশনে টক-শো থাকে। এ সবের প্রতি প্রচুর আগ্রহ। কিন্তু এখানেও কি যা খুশি, তা বলা বা লেখা যায়?

খুলনায় গিয়েছি ২ ডিসেম্বর রাতে। পরিচ্ছন্ন মনে হয়েছে বিভাগীয় শহরটিকে। সড়ক প্রশস্ত। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় শহরে পৌঁছে যাই। দুই দশক আগের খুলনা যেন এখন অনেকটাই অচেনা। আমার বক্তব্যের শুরুতে উপস্থিত সকলকে প্রশ্ন করি, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে ও পরে সড়ক পথে সফরের অভিজ্ঞতা বিষয়ে। সকলের বিবেচনাতেই এক অবিশ্বাস্য ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে গেছে অনেক ক্ষেত্রে। যাতায়াত সহজ হয়েছে।

খুলনা-যশোর-বরিশাল পরিণত হয়েছে ঢাকার পড়শি শহরে। মংলা বন্দর এখন প্রাণচঞ্চল। অথচ সেতুটি উদ্বোধনের আগে ও পরের মাস খানেক আলোচনায় এ সব সম্ভাবনা নয়, প্রধান্য পেয়েছে সেতুর টোল ও রেলিংয়ের কয়েক হাজার নাট-বল্টু থেকে একটি খুলে নেওয়ার ঘটনা। নাট-বল্টু হাতে এক তরুণ বলছে, ‘এই হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু!’ সামাজিক গণমাধ্যমে শুধু নয়, সংবাদপত্র-টেলিভিশনেও এটি প্রচারিত হয়। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সেতুটি ভেঙে পড়ল।

সেতু উদ্বোধনের পরের সাড়ে পাঁচ মাসে কয়েক লাখ গাড়ি পারাপার করেছে সেতু দিয়ে। কারও কাছে কিন্তু সেতুটি অনিরাপদ মনে হয়নি। যারা নাট-বল্টু নিয়ে মেতেছিল, তারা গঠনমূলক সাংবাদিকতা করেনি।

খুলনা অনেকটাই বদলে গেছে। শহর বেশ পরিচ্ছন্ন। সড়কগুলো প্রশস্ত। যানজট তেমন নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট ভালো। বিদ্যুৎ বিভ্রাট নেই। আমরা তিনদিন ছিলাম শহরে, এ সময়ে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি। কয়েকদিন আগে বরিশাল ছিলাম। সেখানেও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ঢাকার যে এলাকায় বসবাস করি, সেখানেও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে এক মাসে। কিন্তু টেলিভিশন বা সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এ চিত্র তেমন আসে না। অথচ সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগ ঘোষণা দিয়ে যখন লোডশেডিংয়ের কথা জানায়, তখন বিদ্যুৎ না থাকার যন্ত্রণা নিয়ে অনেক প্রতিবেদন আমরা দেখেছি। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মোমবাতি-হ্যারিকেন নিয়ে পড়ছে, এমন খবর অনেক দেখেছি। কিন্তু পরিস্থিতির ভালোর দিকের পরিবর্তন ঘটলে সেটা কেন তুলে ধরা হবে না?

আরও পড়ুন: ডিপ স্টেট!

ফ্যাক্ট চেকিং প্রসঙ্গে আসি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে তাদের বিভাগীয় সমাবেশে যে বক্তব্য রেখেছেন, যুগান্তর অনলাইনে তার শিরোনাম দেওয়া হয়েছিল এভাবে, কাদেরকে ‘অবজ্ঞা’ করে যা বললেন ফখরুল। মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, কী যেন নাম তার? ওবায়দুল কাদের সাহেব। … কোন সংবিধান? যে সংবিধান তোমাদের ক্ষমতায় রাখার জন্য বার বার কাটাছেঁড়া করেছ, সেই সংবিধান? তিনটা অনুচ্ছেদ রেখেছ, যার বিরুদ্ধে একটা কথাও বলা যাবে না। সেই সংবিধান চলতে পারে না। … এই আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৭৩ দিন হরতাল করেছে।’

ফ্যাক্ট চেকিং কী বলে? আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত করে ২০১১ সালের ৩০ জুন। পঞ্চদশ সংশোধনী নামে পরিচিত এ সংশোধনী গৃহীত হয় যে সংসদে (নবম জাতীয় সংসদ) সেটা নির্বাচিত হয়েছিল ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছিল। খালেদা জিয়া ছিলেন সংসদে বিরোধী দলের নেতা। পঞ্চদশ সংশোধনী কারও পছন্দ নাও হতে পারে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচন যেভাবে হয়েছিল, সেটা কারও পছন্দ নাও হতে পারে। কিন্তু ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচন হয়েছিল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে, যাতে সব দল অংশ নিয়েছিল। ভোটার উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। কিন্তু বিএনপি’র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল যে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের হাতে, তিনি কীভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন? তিনি কীভাবে সংবিধান থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের ক্ষমতাবলে চার মূলনীতির অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিয়েছিলেন?

খ্যাতিমান সাংবাদিক অ্যান্থনী মাসকারণহাস লিখেছেন, ‘আগের বছর (১৯৭৬) ২৮ নভেম্বর জিয়া সিদ্ধান্ত নেন’ প্রেসিডেন্ট সায়েমকে একসঙ্গে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট পদে রাখা তাঁর জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে। তিনি হঠাৎ করে ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করতে সায়েমকে বাধ্য করেন। ২৮ নভেম্বর রাতে  জিয়া ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল এরশাদ, চিফ অব স্টাফ আবুল মঞ্জুর, নবম ডিভিশনের কমান্ডার জেনারেল মীর শওকত আলী, নৌ ও বিমান বাহিনীর দুই প্রধান এবং প্রেসিডেন্টের বিশেষ সহকারী বিচারপতি সাত্তারকে নিয়ে বঙ্গভবনে যান। তিনি প্রেসিডেন্টের প্রতি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ ছেড়ে দিতে বলেন, কিন্তু বিচারপতি সায়েম জিয়ার অনুরোধ প্রত্যাখান করেন। বিচারপতি সাত্তার সায়েমকে বলেন, ভাই, জিয়া যখন সিএমএলএ পদটা চাইছেন, পদটি আপনি তাকে দিয়ে দেন। রাত ১ টার দিকে সায়েম একটু নরম হলেন এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ হস্তান্তরের কাগজে সই করেন।… আসলে জিয়ার দরকার ছিল কেবল ক্ষমতা আর প্রকৃত ক্ষমতা। (বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ, পৃষ্ঠা ১৫৬)

তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান মাত্র ৪৩ বছর বয়সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিচারপতি সায়েম তাঁর ঘোষণায় বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি জিয়াউর রহমানের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করছি। কিন্তু তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ওই ঘোষণা প্রদান করেননি। জিনারেল জিয়া বিচারপতিকে ওই ঘোষণা দেওয়ার জন্য বলপ্রয়োগ করেছিলেন।’ (বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ, পৃষ্ঠা ১৫৫)

মির্জা ফখরুল ইসলাম এবং বিএনপির অন্য নেতারা কি এ ইতিহাস ভুলে গেছেন?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কায়েমের জন্য আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল, এ তথ্য সম্পর্কে ফ্যাক্ট চেকিং কী বলে? ১৯৯৬ সালের ৩ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় প্রথম পৃষ্ঠায় একটি বক্স আইটেম ছাপা হয় এভাবে, ‘১৯৯৫ সালে সমাবেশ-১৪২, হরতাল ১৭১, ঘেরাও ও অবরোধ’ ১৮। মিডিয়া সিন্ডিকেটের পরিবেশিত এ খবরে বলা হয়, তিন প্রধান বিরোধী দল এ সব কর্মসূচি পালন করে জনগণকে চরম দুরবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায় মিলে ১৭১টি হরতাল হয়েছে। ১৯৭৪ সালে স্থানীয় ও আঞ্চলিক হরতাল মিলিয়ে হরতাল হয়েছিল ৭৪টি।

আরও পড়ুন: আমরাও পারি

১৯৯৫ সালে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামের ডাকে দেশব্যাপী হরতাল হয়েছিল ৩৪টি। (দৈনিক বাংলা, ৩ জানুয়ারি ১৯৯৬)

মির্জা ফখরুল ইসলাম ১৭৩টি জাতীয় হরতালের তথ্য কোথায় পেলেন?
হরতাল বিষয়ে বিএনপি নেতাদের একটি তথ্য দিতে পারি, যার সত্যতা তারা বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা থেকে যাচাই করে নিতে পারেন। ‘সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি’ আমার এ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। এর ১৯ পৃষ্ঠায় হরতাল ২০১৩ (জাতীয় ও স্থানীয়) ছকে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে জাতীয় হরতাল হয়েছে ৮৬টি (এর মধ্যে পূর্ণ দিবস ৮৫টি), স্থানীয় হরতাল হয়েছে ২৭৯টি (পূর্ণ দিবস ২১৫টি)। এ সব হরতাল ডেকেছিল বিএনপি ও তাদের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ বা সিপিডি জানিয়েছে, জুলাই ২০১৩ থেকে জানুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত সময়কালে হরতালে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ৪৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা। এফবিসিসিআই বলেছে, ‘এক বছরে হরতালে ক্ষতি এক লাখ কোটি টাকা।’ (সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি, পৃষ্ঠা ১৯-২১)
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল কিংবা তাদের বিষয়ে জনমনে ভুল ধারণা সৃষ্টির জন্য চেষ্টা থাকেই। কিন্তু তাই বলে মাত্রাহীন মিথ্যাচার? ফ্যাক্ট চেকিং বলে কিছুই থাকবে না? যে  যা বলবে, গণমাধ্যম সেটাই প্রচার করবে?     

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button
error: Content is protected !!