এশিয়ার তারকা দেশগুলোর কাতারে উঠে আসবে বাংলাদেশ
<![CDATA[
বাহ্যিক বিভিন্ন কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ স্বল্পমেয়াদি কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেলেও মধ্যমেয়াদে দেশটির জন্য উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যান জোসে ভিনালস। বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর) ঢাকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশকে স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত সপ্তাহে চার দিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যান জোসে ভিনালস। এ সময় তিনি নিয়ন্ত্রক, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ এবং অন্য গ্রাহকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের প্রশংসা করে তিনি বলেন, করোনা মহামারি ও অন্যান্য সমস্যা সত্ত্বেও এ খাতের কর্মীরা ব্যাপক উন্নতি করেছে।
বেসরকারি খাতের কর্মীদের প্রচুর প্রাণশক্তি রয়েছে এবং তারা সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছে উল্লেখ করে জোসে বলেন, মধ্যমেয়াদে এশিয়ার তারকা দেশগুলোর কাতারে উঠে আসবে বাংলাদেশ। ৫ থেকে ১০ বছর সময়ের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়ে আমি বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি সম্ভাবনা সম্পর্কে খুব ইতিবাচক।’
জোসে ভিনালস ২০১৬ সালের অক্টোবরে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডে যোগদান করেন এবং ডিসেম্বরে গ্রুপটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সমস্যা ও করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ বছর খুব ধীরগতিতে হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে জোসে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আগামী ৫ থেকে ৭ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ থেকে ৭.৫ শতাংশ।’
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আমাদের ব্যবসাক্ষেত্র সহজ করতে হবে, অর্থনৈতিক শাসন, প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসন জোরদার করতে হবে এবং অর্থনীতি ও রফতানি উৎসের বৈচিত্র্য অব্যাহত রাখতে হবে। এ ছাড়া আমাদের উন্নত অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে।
আরও পড়ুন: তারল্য সংকট কাটাতে ইসলামি ব্যাংকগুলোকে বিশেষ সুবিধা
সাবেক আর্থিক পরামর্শদাতা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের পরিচালক হোসে বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া এবং এরপর উচ্চ আয়ের মর্যাদা অর্জনের জন্য এগিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে এবং প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষগুলো পূরণ করতে পারে তবে তা দেশটির জন্য অনেক ভালো হবে। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও আর্থিকভাবে সাহায্য করার জন্য স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সবসময় পাশে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, ‘এগুলোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগমন নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পর বাংলাদেশ অগ্রাধিকারমূলক বাজার হারাবে। কেননা তখন আপনাকে উচ্চতর বাজারে লড়াই করতে হবে। সেখানে প্রতিযোগিতা করতে হবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ এখনই তৈরি পোশাক শিল্পের শীর্ষস্থানীয় বাজারে পরিণত হয়েছে এবং চীনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক উৎপাদনকারী।
আরও পড়ুন: ব্যাংকের চেয়ারম্যান-নির্বাহীদের গাড়ি ৮ বছরের আগে পরিবর্তন নয়
জোসে বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি খেলায় সঠিক কার্ডটি ফেলতে পারে তবে তারা শিগগিরই আরও অনেক উন্নতি করবে। বাংলাদেশের সেই সম্ভাবনা রয়েছে। তারা অতিরিক্ত সময়ের মধ্যে রফতানিতে বৈচিত্র আনতে পারবে।’
ইতোমধ্যে অনেক কোম্পানি উত্তর এশিয়া বিশেষ করে চীন থেকে সরে যাচ্ছে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় স্থানান্তরিত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমি মনে করি খুব ভালো শ্রমশক্তি থাকায় বাংলাদেশের একটি অনন্য সুযোগ রয়েছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানে শ্রমিকমূল্য কম।
জোসে বলেন, ব্যয় ও অবস্থানগত সুবিধা, মার্কিন-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং এই অঞ্চলে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে বাংলাদেশের আরও লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যানের মতে, প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো আইনের শাসন শক্তিশালী, সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানই শক্তিশালী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী এবং সেখানে সুশাসন রয়েছে; তা নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের সম্ভাবনা, সক্ষমতা দুই-ই আছে
হার্ভার্ড থেকে অর্থনীতিতে ডক্টরেট এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেছেন জোসে। তিনি মনে করেন, সংকটগুলো সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিতে পারে যদি সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কাছে এখন এগিয়ে যাওয়ার এবং অনেক বিষয় এগিয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে; যা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য নয় বরং মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও প্রতিষ্ঠা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষাৎকারে, জোসে আইএমএফের সঙ্গে একটি ‘স্টাফ-লেভেল’ চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসাবে বর্ণনা করে বলেন, আগামী দিনে এটি নিশ্চিত হলে, আইএমএফ তাদের স্বল্পমেয়াদি ঋণ প্রদানের ভারসাম্য এবং মুদ্রার সমস্যা মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো, আইএমএফের কাছে যাওয়ার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এক্ষেত্রে অনেক সময় দেরি হয়ে যেতে পারে এবং সমস্যাগুলো আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশ সৌভাগ্যবশত একটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে রয়েছে এবং দেশটির উচ্চ বৈদেশিক ঋণ নেই। যদিও বৈদেশিক রিজার্ভ হ্রাস পেয়েছে, তবুও তারা কয়েক মাস ধরে নিয়মিত আমদানি করছে।’
আরও পড়ুন: যেসব কারণে ধসে পড়ল ক্রিপ্টো রাজার রাজত্ব
ব্যাংকিং খাতে চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জোসে বলেন, ‘সব ব্যাংকিং সিস্টেমে সবসময় কিছু সমস্যা থাকে এবং তাদের সম্পদের গুণমান উন্নত করতে, ব্যালেন্স শিটগুলো স্পষ্ট করতে, ব্যাংকের মূলধন এবং শাসনব্যবস্থা উন্নত করতে সবসময় কিছু করা যেতে পারে।’
বিশ্বায়নের একজন প্রবক্তা হিসেবে জোসে মনে করেন, বাংলাদেশের বিশ্বায়ন প্রয়োজন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশের মতো দেশ দরকার যারা অনেক কিছুর জন্য ‘বিশ্বের কারখানা’ হতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তার হাতে। বাহ্যিক অবস্থা এক বা অন্য দিকে যেতে পারে এবং তা জীবনকে সহজ বা আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তবে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের যে পদক্ষেপ নেবে সেটিই পার্থক্য তৈরি করবে।
বাংলাদেশের প্রশংসা করে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ অতীতের তুলনায় অনেক ভালো করছে এবং অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। তারা অভ্যন্তরীণ অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে।
]]>




