ঋণ করে কখন ঘি খাওয়া যায়
<![CDATA[
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। পরদিন পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের ঢাকা অফিসে (মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার যে অফিসটি দ্রুতই পরিচিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশ ব্যাংক হিসেবে) রাখা হিসাবে দেখা যায়, নবজাত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ মাত্র ১৮ মার্কিন ডলার। [বিবিসি, ১৭ ডিসেম্বর ২০২১]
বিবিসি ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর এক প্রতিবেদনে জানায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের ধারণা মোটেই ভালো ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কয়েকটি উন্নত পশ্চিমা দেশ পরিচালিত সংস্থা হচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। আমরা স্মরণ করতে পারি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় যুক্তরাষ্ট্র চায়নি। সে সময় ওই দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। তিনি ও তার সহকর্মীরা মনে করনে বাংলাদেশ একটি ‘বাস্কেট কেস’।
এ দেশটি টিকে থাকবে কি-না, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়। সব কিছুতে কেবল নাই আর নাই। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সম্পর্কে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে বলা হয়: এ দেশটির একজন গড়পড়তা মানুষের জীবন হচ্ছে এ রকম বাংলাদেশের আশি ভাগ মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত। একজন গড়পড়তা কৃষকের জমি আছে দেড় একর, সে গ্রামের ধনী কারও কাছ থেকে আরও এক একর বর্গা নেয়। তার আছে একটি রুগ্ন গরু, যেটি দিয়ে সে হাল চাষ করে। তার একমাত্র সম্পদ হচ্ছে সারা বছর খাওয়ার জন্য যে ধান মজুদ রাখে। অন্য যে কোনো উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য তাকে হয় আত্মীয়-স্বজন অথবা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার করতে হয়। যেহেতু নূন আনতে পান্তা ফুরায়, তাই কোনো রকমে সুদটাই যে শোধ করতে পারে, আসল আর শোধ করা হয় না।
বিবিসির এ প্রতিবেদনে অধ্যাপক নুরুল ইসলামের মন্তব্য জুড়ে দেয়া হয়। তিনি ষাটের দশকের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অর্থনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার সঙ্গে আরও ছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক আনিসুর রহমান প্রমুখ। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের প্রথম প্রতিবেদন ছিল খুবই নেতিবাচক। এরপর জনসন নামে একজন আমেরিকান কূটনীতিক বলেছিলেন এ রাষ্ট্র বেশিদিন টিকবে না। এ রাষ্ট্র হবে ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস। বিশব্যাংকের কর্মকর্তা জাস্ট ফালান এবং তার আরও একজন সহযোগী লিখেছিলেন ‘বাংলাদেশের জিওগ্রাফি ঠিক আছে। কিন্তু অর্থনীতি ঠিক নেই। এই দেশের অর্থনীতি টেকসই হতে দু’শ বছর সময় লাগবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন যদি সম্ভব হয়, তাহলে আফ্রিকাসহ বিশ্বের যে কোনো দেশেরই উন্নয়ন সম্ভব।’
বিশ্বব্যাংক পাঁচ দশক পর বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কী বলছে? কালের কণ্ঠ ১৮ ডিসেম্বর (২০২২) লিখেছে: বাংলাদেশের ‘বৈদশিক ঋণ পরিশোধ বাড়ল ৪ গুণ’। বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট-২০২২ অনুযায়ী ২০২১ সালে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে প্রায় ৫.২৯৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আসল পরিশোধ ছিল ৪.২০৭ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ ছিল ১.৮৮ বিলিয়ন ডলার। আগের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধ করেছিল ৩.৭৩৪ বিলিয়ন ডলার। এক দশক আগে ২০১০ সালে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১.২৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আসল পরিশোধ করা হয় ০.৮২১ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ ০.২০৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক দশক ঋণ পরিশোধ বেড়েছে চার গুণ।
আরও পড়ুন: ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে, বৈদেশিক ঋণও বেড়েছে। ঋণ করলে তা পরিশোধ করতে হয়। যারা ঋণ দেয়, তারা প্রথমেই নিশ্চিত হতে চায় গ্রহীতার পরিশোধ করার ক্ষমতা কতটা রয়েছে। আমাদের এ অঞ্চলে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করলে চড়া হারে সুদ দিতে হতো। মহাজনের ঋণ গ্রহণ করতে হলে জমি-বাড়ি-স্বর্ণালঙ্কার, এ ধরনের কিছু না কিছু বন্ধক রাখতে হয়। ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে এ বন্ধক রাখা সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। ব্যাংক থেকে কেউ ঋণ নিলেও স্থাবর সম্পদ বা অন্য কিছু জামানত রাখতে হয়। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়।
বাংলাদেশ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ গ্রহণের জন্য আলোচনা শুরু করেছে। এ সংস্থা ঋণের জন্য নানাবিধ শর্ত দেয়। তাদের যুক্তি ঋণ নিলে ফেরত দিতে হবে। খেলাপি হওয়া চলবে না। তাই আগেভাগেই বুঝে নিতে হবে অর্থনীতি ঠিকভাবে চলছে কি-না কিংবা ভবিষ্যতে ঠিকভাবে চলবে কি-না। শ্রীলংকা বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষ করে চীন থেকে প্রচুর ঋণ নিয়েছে। কিন্তু ঋণ নিয়ে উপযুক্ত প্রকল্পে তা বিনিয়োগ হয়নি। ফলে প্রকল্পগুলো থেকে যথেষ্ট আয় হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে পারছিল না। অর্থনীতির বিভিন্ন শাখা কৃষি-শিল্প-সেবা খাতে সমস্যা দেখা দিতে থাকে। বাজারে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু ধরনের পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়। ওষুধের সংকট তীব্র হয়। কারণ এ দরকারি পণ্য প্রধানত আমদানি করতে হয়। কিন্তু দেশটির হাতে আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বৈদেশিক মুদ্রা নেই। অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত মানুষ বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। তারা সরকারের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশ প্রধানত বিদেশি ঋণ নিয়েছে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো সংস্থা থেকে। এ সব সংস্থার কাছ থেকে যে ঋণ মেলে তার সুদের হার কম এবং পরিশোধ করতে দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়। এর বাইরে জাপান থেকে নিয়মিত সহজ শর্তে ঋণ মেলে। যুক্তরাষ্ট্র থেকেও এক সময় ঋণ মিলত, কিন্তু এখন তা শূন্যের ঘরে। তবে তারা খবরদারি- মোড়লগিরি একটুও কমায়নি। বাংলাদেশে নিযুক্ত ওই দেশের রাষ্ট্রদূত কিংবা দূতাবাসের নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে কখনও দ্বিধাবোধ করেন না, যেমনটি তারা ১৯৭২ সালে বলেছিলেন বাংলাদেশ একটি বাস্কেট কেস, যারা টিকবে না। বাংলাদেশের ভেতরেও একটি মহল এ ধরনের হস্তক্ষেপে দোষের কিছু দেখে না, বরং তাকে স্বাগত জানায়।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গ শেখ হাসিনার সরকারের বিরোধ দেখা দেয় পদ্মা সেতু নির্মাণের সময়। বিশ্বব্যাংক চেয়েছিল এ সেতু নির্মাণের ব্যয় ও অন্যান্য কাজ তদারকি নিজেদেও হাতে রাখতে। কিন্তু সরকার রাজী হয়নি। এক পর্যায়ে তারা অভিযোগ করে সেতু নির্মাণের অর্থ ব্যয়ে দুর্নীতির সম্ভাবনা রয়েছে। তারা নিজেরা সরে যায় ঋণ প্রদান থেকে, অন্যদেরও প্ররোচনা দেয় একই কাজে। শেখ হাসিনা নিজেদের অর্থে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে পদ্মা সড়ক-রেল সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন এবং তা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারেন। পরে বিশ্বব্যাংক ভুল বুঝতে পারে এবং প্রকাশ্যেই তা স্বীকার করে।
বাংলাদেশকে ঋণ জোগানো প্রধান তিনটি দেশ এখন রাশিয়া, চীন ও ভারত। তাদের ঋণের সুদের হার বিশ্বব্যাংকের মতোই কম, তবে পরিশোধের মেয়াদও কম। ঋণ ব্যবহার করে সুফল পেতে না পেতেই সুদ ও আসলের কিস্তি পরিশোধের সময় হয়ে যায়। এই তিনটি দেশ থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার বেশি অংকের ঋণচুক্তি হয়েছে। আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে এ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। চলতি অর্থ বছরে বিদেশি ঋণর সুদ-আসলের কিস্তিবাবদ বাংলাদেশকে ২.৭৮ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। গত বছর পরিশোধ করা হয়েছিল ২.৪৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৯-২০৩০ সালে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫.১৫ বিলিয়ন ডলার। পরের বছরগুলোতে অবশ্য এ অংক কমতে থাকবে। তবে নতুন করে ঋণ নিলে এবং তা পরিশোধের সময় কম হলে দুশ্চিন্তার কারণ বৈকি।
কিন্তু ঋণ পরিশোধ করতে হলে আয় বাড়াতে হয়। এ আয় কেবল টাকায় হলে চলবে না, বিদেশি মুদ্রাতেও হতে হবে। অর্থাৎ রফতানি, রেমিট্যান্স, বিদেশি ঋণ প্রভৃতি সূত্র থেকে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ কতটা? ২০০৫-২০০৬ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৯৪ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯-২০১০ সালে তা কাছাকাছিই ছিল ২০৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২০-২০২১ সালে ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫০৮৭ বিলিয়ন ডলার।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে পরিণত হতে চলা বাংলাদেশের জন্য এ ঋণ বেশি নয়। ঋণের অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে আরও বেশি ঋণ নিতে পারে বাংলাদেশ। ঋণের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়েও অর্থনীতির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশের অর্থনীতির কিছু সূচক উৎসাহব্যঞ্জক। যেমন, ৩০ জুন ২০০৭ তারিখ ব্যাংকে জমার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি ডলার। ২০২২ সালের ৩০ জুন এ পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৭৪ হাজার কোটি ডলার। এ সময় ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি জমা থাকা অ্যাকাউন্ট ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৪৫৭টি। এ তথ্য ব্যাংকিং খাতের প্রসারের চিত্র তুলে ধরে।
আরও পড়ুন: বুদ্ধিজীবী হন্তারকরা সওয়ার বিএনপির কাঁধে
২০০৫-২০০৬ অর্থ বছরে বাংলাদেশের রফতানি ছিল ১০.৫২ বিলিয়ন ডলার, গত অর্থ বছরে (২০২১-২০২২) যা ৫২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এ সময় আমদানি ব্যয় ১৪.৭৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৯২ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশে চাল-গম-ভুট্টার উৎপাদন অনেক আগেই চার কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধান উৎপাদন ব্যাহত হলে মাঝেমধ্যে চাল আমদানি করতে হয়। গমের চাহিদা বাড়ছে এবং কোনো কোনো বছর ৮০-৮৫ লাখ টন পর্যন্ত গম আমদানি করতে হয়। তবে লক্ষণীয় যে গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা প্রভৃতি দেশ থেকে বাংলাদেশ কোনো খাদ্য সহায়তা পায়নি। বাংলাদেশ যে খাদ্য আমদানি করে, তার অর্থ জোগান আসে নিজের ভাণ্ডার থেকে।
বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেবল নিজের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ কিংবা বিদেশি ঋণের সুদ ও আসলের কিস্তি পরিশোধে কখনও ব্যর্থ না হওয়ার মধ্যে সীমিত নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে চাহিদা অনুযায়ী। অভিন্ন সড়ক-রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপিত হয়েছে। উন্নত বিশ্বের দায়িত্বশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রমাগত বার্তা আসছে ২০৩৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৫তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ যেমন চাই, তেমনি প্রচুর ঋণও কাম্য।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা নানা অংকের ঋণ নেয়। গোটা বিশ্বেই এটা নিয়ম। একইভাবে সরকার কিংবা বেসরকারি খাত থেকে বিভিন্ন দেশ থেকে ঋণ গ্রহণেরও রেওয়াজ রয়েছে। এ ঋণ যেন যথাযথভাবে ব্যবহার হয় সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ করে তা সঠিকভাবে ব্যবহার করে তার লাভ থেকে ঘি খাওয়া কিংবা গাড়ি-বাড়ি কেনায় দোষের কিছু নেই, কিন্তু আসল খেয়ে ফেললেই বিপদ।
]]>




