ভবিষ্যত যুদ্ধ পানি নিয়ে
<![CDATA[
আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগে গোল্ডম্যান স্যাক্স নামে একটি আমেরিকান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিল যে, পানিই হবে আগামী শতাব্দীর পেট্রোলিয়াম। একটু ভেবে দেখুন, যদি তাই হয় তাহলে সেই দিন আর খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন হয়তো কথাচ্ছলে ‘পানির দামে কেনা’ বলতে দুষ্প্রাপ্যতা বোঝাতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনের দিনগুলোতে বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ পানি সংকটে পড়বে, যার অর্ধেকই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার। এভাবে সুপেয় পানি যদি অচিরেই মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে এই সংকটের ভয়াবহতা? সামনের দিনগুলোতে কি পানি নিয়েই যুদ্ধে লিপ্ত হবে বিশ্ব? কোথায় কিভাবে পানিযুদ্ধের সৃষ্টি হবে?
এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি মাথায় আসে তা হলো, ভূ-পৃষ্ঠে ৭১ ভাগ পানি থাকার পরেও কেন এই সহজলভ্য পানি ভবিষ্যতে হয়ে উঠতে পারে অমূল্য রতন? কেন বিশ্বে পানি সঙ্কট এতো বড় ইস্যু হয়ে দাড়িঁয়েছে? এর কারণ হলো, এই নীল গ্রহের মাত্র ৩ ভাগ মিঠা পানি। বাদবাকি লোনা পানি। অর্থাৎ এটি স্পষ্ট যে, আগামীতে সুপেয় পানি নিয়েই বিশ্বে সবচেয়ে বড় সঙ্কট তৈরি হবে।
পানি সঙ্কটের কারণ
পানি সঙ্কটের কারণ হিসেবে মোটা দাগে যে ফ্যাক্টরগুলো দায়ী তা হলো পরিবেশ বিপর্যয়, বিশ্বায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ণ, পানি দূষণ ও অপচয়। এসব কারণে প্রাকৃতিক এ সম্পদের উপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে। এই চাপ মোকাবিলায় নদী অববাহিকায় উজানের দেশগুলো গড়ে তুলছে বিশালাকার বাঁধ বা ড্যাম। উজানের দেশগুলোর বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কারণে ভাটি অঞ্চলের দেশগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। যার চরম খেসারত দিচ্ছে নিচু অঞ্চলকে। পানি বণ্টন নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে তৈরি হচ্ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সম্পর্কের অবনতি, যা দেশগুলোর মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থায় দেশগুলোর মধ্যে চলমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে শত শত আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি টিকবে কি না, তা নিয়েও নতুন করে তৈরি হচ্ছে ধোঁয়াশা। এর জ্বলজ্বলে উদাহরণ হচ্ছে নীলনদ নিয়ে ইথিওপিয়ার রেনেসাঁ ড্যাম নির্মাণ প্রকল্প।
কিভাবে হতে পানিযুদ্ধের সূত্রপাত?
পানিই যখন জনপদের জীবন- তাই যেখানে পানি নেই, সেখানে জীবন নেই। এই পরিস্থিতিতে মানুষ এমন সব জনপদের দিকে ছুটবে যেখানে সুপেয় পানি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কিংবা কম মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে দুটি সিনারিয় দেখা যাবে। তা হলো, একদিকে একসময়কার ব্যস্ত, কর্মমুখর নগরগুলো ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হবে। আর অন্যদিকে, পানির বেশি মজুদ রয়েছে এমন অঞ্চলগুলোতে বাড়তে থাকবে অভিবাসীর সংখ্যা। As a result, ওইসব অঞ্চলকে ঘিরে নতুন করে ক্রাইসিস তৈরি হবে।
আরও পড়ুন:বিশ্ব ইতিহাস বদলে দিতে পারে ২০২২ সালের যে তিনটি ঘটনা
গেল শতাব্দীতে তেল, গ্যাস, পেট্রোলিয়ামসহ অন্যান্য non-renewable সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিতে বিশ্বব্যপী যেভাবে রাজনীতির এর প্রেক্ষাপট বদলে যায় বলা যায়, একই বিষয় খাটবে পানির বেলাতেও। আর সুপেয় পানির পরিমাণই যেখানে দিনকে দিন কমছে, সেখানে বিশ্বনেতারা এই লিমিটেড ওয়াটার রিসোর্সের জন্য লড়বেন, সেটা নিশ্চিত। তাই সামনের দিনগুলোতে পানি সম্পদের ভাগাভাগি নিয়েও আন্তর্জাতিক রাজনীতের ফ্রেম মোটামুটি সুস্পষ্ট। যেখানে দ্বিপাক্ষিক বিষয়, নদী তীরবর্তী দেশগুলোর নিজেদের স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুও ইম্পোর্টেন্ট ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।
কোথায় পানিযুদ্ধ দেখা যেতে পারে?
দর্শক, যেখানে চাহিদার তুলনায় সুপেয় পানির সরবরাহ কম, সেখানে পানির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। আশপাশে তাকালেই দেখা যায়, বাসাবাড়ির ভোক্তা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল বনাম শহরাঞ্চল, কৃষিখাত বনাম শিল্পখাত, এমনকি আন্ত-দেশীয় ও অন্তর্দেশীয় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে নতুন রূপে শুরু হতে পারে পানি নিয়ে কোন্দল। এই পানিই হয়ে উঠবে শোষণের অন্যতম হাতিয়ার, যা ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয়েছে।
ইতিহাসের বড় বড় নগরী ও সভ্যতা মূলত পানির উৎসকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সেই বড় শহরগুলোই পানির সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এদের মধ্যে কিছু শহরের তো যথারীতি পানিশূন্য হওয়ার মতো অবস্থা। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের কথাই ধরা যাক। বিশ্বের বৃহত্তম শহরগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম কেপ টাউনেই পানি ফুরিয়ে যাবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে লন্ডন, ইস্তাম্বুল, মস্কো, জাকার্তা, কায়রো, বেইজিং, ব্যাঙ্গালোর, সাও পাওলোর মতো আরও বহু শহরের নাম। কয়েক বছরের মধ্যে এই শহরগুলোতে পানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ ধারণ করবে। এতে সংকটের মুখে পড়বে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি।
আরও পড়ুন:বিশ্বের দশ দীর্ঘতম মেট্রোরেল
পানি সঙ্কটের ব্যাপ্তি
২০১৬ সালে ভারতের কাবেরি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কর্নাটক ও তামিলনাড়ু রাজ্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এতোটাই ভয়াবহ হয় যে একই দেশের দুটি অঞ্চল একে অন্যের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। যা দেখে অবাক পুরো বিশ্ব। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশেরও অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে একটি অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। যেটি নিয়ে বহু বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে চুক্তির কথা থাকলেও কেবল আশ্বাসেই আটকে আছে তিস্তা ইস্যু। দর্শক, ভারতবর্ষ নয়, আফ্রিকা মহাদেশের কেনিয়ায় বিভিন্ন আদিবাসী গোত্রের মধ্যেও পানি নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে। সুদানের দারফুরে গৃহযুদ্ধ শুরুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পানি সংকট। এছাড়া নীল নদের ওপর রেনেসাঁ বাঁধ তৈরির জের ধরে ইথিওপিয়া এবং মিশরের মধ্যেও ব্যাপক দ্বন্দ্ব চলছে। এর পাশাপাশি আমাজন, মেকং এবং দানিউবের মতো বড় বড় উৎসের পানির অংশীদারিত্ব নিয়ে সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। যা বর্তমানে নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
এছাড়াও লেবানন-ইসরাইলের মধ্যে হাসবানি নদী; তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে ইউফ্রেটিস; সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে গ্যালিলি সাগর; ইসরাইল, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের মধ্যে জর্ডান নদী; সুদান, মিশর, ইথিওপিয়া ও আরও কিছু দেশের মধ্যে নীলনদ; সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ার মধ্যে সেনেগাল নদী; ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে হেলম্যান্ড নদী নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
সমাধান
বিশ্বনেতারা যখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ব্যস্ত, বিজ্ঞানের জয়জয়কার যখন আধুনিক বিশ্বে, তখন প্রায় ১৫০ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য নেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা। প্রতি বছর শুধু পানিবাহিত রোগে মারা যাচ্ছে কোটি কোটি মানুষ। এ অবস্থায় পানি যুদ্ধ ঠেকাতে মিঠা পানির ক্রমবর্ধমান ঘাটতি পূরণ করতে হবে।
এজন্য অনেক দেশই মডার্ন টেকনোলজির দিকে ঝুঁকছে। তেমনই একটি উপায় হলো সমুদ্রের নোনা জলকে লবণমুক্ত করার প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে বিশাল নোনা জলকে সুপেয় পানিতে পরিণত করা যায়। আশার কথা হলো, বিগত এক দশকে ডিস্যালাইনেশন প্রসেসের ব্যবহার দ্বিগু হারে বেড়েছে।
বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে সঙ্কট সমাধানে পুরো বিশ্বে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এখনই। এই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। নয়তো অচিরেই বিশ্ব এমন এক ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত হবে যেখানে বন্দুক, মিসাইল কিংবা পারমাণবিক বোমা নয়, পানিই হবে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
]]>




