বাংলাদেশ

তাবলিগ জামাতের বিভাজন ও বর্তমান বিশ্ব ইজতেমা

<![CDATA[

বিশ্ব ইজতেমার আগের সেই আমেজ নেই। বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ এখন কহর দরিয়া খ্যাত টঙ্গির তুরাগ তীরে আসে না। দেশীয় ফেরকার মানুষদেরই ভিড় সেখানে বেশি। দুটি ইজতেমাতেই একই অবস্থা। এক ইজতেমার মানুষ অপর ইজতেমার প্রাণের শত্রু। সব শক্তি দিয়ে একে অপরের সর্বনাশ করতে সদা প্রস্তুত। এই শত্রুতা ও বিদ্বেষকেই তারা তাদের ধর্ম মনে করছেন। ইসলাম অর্থ যে শান্তি তা যেন তারা বেমালুম ভুলেই গেছেন। মতের ভিন্নতা হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে এভাবে খড়গহস্ত হওয়ার কোনো মানে হয় না। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে ভিন্নতর এক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছেন বর্তমান তাবলিগের অনুসারীরা।

তাবলিগের কাজ একটি সুন্দর বিষয়। অপূর্ব এক ধারা গড়ে উঠেছিল উপমহাদেশে তাবলিগের মাধ্যমে। যার যার জান মাল নিয়ে দ্বীন শিখতে নিজের এলাকা ছেড়ে দূরের কোনো অঞ্চলে পাড়ি জমান তাবলিগ ওয়ালা মুসল্লি। চিল্লা, তিন চিল্লা পার করে ঘরে ফেরেন ইমানের বলে বলিয়ান হয়ে। নিঃস্বার্থ এক মেহনত। দীর্ঘ এক সাধনা। ঘর বাড়ি পরিবার পরিজন ছেড়ে কিছু দিনের জন্য মানব কল্যাণে বেরিয়ে যাবার রীতি বিশ্বের ইতিহাসে একেবারেই নতুন। দিল্লির গঙ্গা যমুনা মোহনায় এই সুন্দর ধারার উদ্ভব হলেও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুততর সময়ে। বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এর জন্ম। মাত্র দুই দশক পরই সেটি ব্রিটিশ ভারতের সীমানা অতিক্রম করে পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রে প্রসারিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হবার পর পাকিস্তান আন্দোলনের আলেমরা চেয়েছিলেন ভারত থেকে পাকিস্তানে তাবলিগের মার্কাজ স্থানান্তর করতে।

মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভিকে সপরিবারে বিমানে করে নিয়ে যাবার সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। ফাজায়েলে আমাল গ্রন্থের লেখক শাইখুল হাদিস যাকারিয়া কান্ধলভির পরামর্শে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভি। ভারতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাবলিগের শীর্ষ মুরুব্বিরা। পাকিস্তানের তাবলিগের অনুসারীরা করাচির রায়বেন্ডে আরেকটি মার্কাজ নির্মাণ করেন। এদিকে ঢাকার কাকরাইলে তৃতীয় আরেকটি কেন্দ্র গড়ে ওঠে তাবলিগ জামাতের। এই তিনটি কেন্দ্র থেকেই বিশ্বব্যাপী তাবলিগের কাজ চলে আসছে শত বছর ধরে। মূল তিনটি কেন্দ্র হলেও দিল্লির নিজামুদ্দিনকেই সবাই প্রধান কেন্দ্র হিসেবে মান্য করত। ২০১৭ সালে প্রথম বিভক্তি দেখা দেয় তাবলিগ জামাতে। বিভক্তি আগেও ঘটেছে একাধিকবার। কিন্তু সেসব বিভক্তি দ্রুতই মিলিয়ে গেছে। তথ্য প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের কারণে এবারের বিবাদ বিরাট আকার ধারণ করে। প্রতিটি মসজিদ ও মহল্লায় এমনকি তাবলিগি প্রতিটি পরিবারে এর প্রভাব পড়ে। অনেক পরিবারে কেবল এ কারণে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে। ভাই-বোন বাবা মা পারস্পরিক চরম কলহে পড়ে যায়। বাবা এক পক্ষে তো ছেলে এক পক্ষে। ভাই এক পক্ষে তো বোন আরেক পক্ষে। স্বামী একদিকে তো স্ত্রী আরেক দিকে। মসজিদগুলোতেও দুপক্ষ যুদ্ধংদেহী হয়ে উঠে।

বলা বাহুল্য এমন কঠোর অবস্থা বাংলাদেশেই পরিলক্ষিত হয়। পৃথিবীর আর কোথাও এমন পরিস্থিতি চোখে পড়েনি। বিশেষত হেফাজতের নেতারা এটাকে তাদের প্রধান এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করায় বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন আকার ধারণ করে। দিল্লির মাওলানা সাদ সাহেব ২০১৮ সালে বিমানবন্দরে এসে ফিরে যান। ঢাকার সব মাদরাসার ছাত্ররা তার বিরুদ্ধে জুতা মিছিল করে। বিমানবন্দর ঘেরাও করে হেফাজতি আলেম ও ছাত্ররা। এরই জের ধরে পরের বছর দু’পক্ষ টঙ্গির ইজতেমা ময়দানে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়।

দুপক্ষের মাঝে দিন দিন এ দূরত্ব আরও বেড়েই চলেছে। প্রথম ইজতেমার অনুসারীরা বলছে, পরের ইজতেমা কোনো ইজতেমা নয়, এটা একটা পিকনিক। গুজব উঠছে দ্বিতীয় ইজতেমায় বিরাট হাঙ্গামা হবে। দ্বিতীয় ইজতেমার অনুসারীরা বলছে, প্রথম ইজতেমা কোনো ইজতেমা নয়, এটা একটা মাহফিল। মাদরাসার ছাত্ররা এই মাহফিলের শ্রোতা। একে অপরকে হেয় করে এভাবে নানা কথা রটানো হচ্ছে। 

ইজতেমার যে এক সৌন্দর্য ও মাহাত্মতা এভাবেই নষ্ট হয়ে গেছে। যেখানে আগে কয়েক হাজার বিদেশি মেহমান ইজতেমায় অংশগ্রহণ করত সেখানে এবার দেখা গেছে মাত্র চার পাঁচ হাজার মেহমান এসেছেন। রাসুল সা. ইরশাদ করেন, যখন আমার উম্মত পরস্পরে গালাগালি করবে তখন তারা আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে পড়ে যাবে। [ইবনু আবিদ দুনিয়া] এই হাদিসের বাস্তবতা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠি দূরে সরে যায় তখন তাদের কাজগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। পারস্পরিক গালি গালাজ করে কখনও ইসলামের কাজ করা যায় না।

ইসলামের দাওয়াত ও তবলিগ করতে হয় একে অপরকে সম্মান দিয়ে, পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে। সেই মহব্বত ও শ্রদ্ধা যখন নষ্ট হয়ে যায় তখন ইসলামের কাজ হয় না, যা হয় তাকে ফেরকাবাজি বলে। তাবলিগ কোনো দলাদলি নয়। তাবলিগের উদ্দেশ্য মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা। হেকমত প্রজ্ঞা কৌশল ও সুন্দর কথার মাধ্যমে। সব ধরনের বিবাদ ও ঝগড়া পরিহার করে। পারস্পরিক বিবাদের কারণে আজ তাবলিগের কাজ হয়ে গেছে ফেরকা তৈরির উৎস। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা প্রিয় নবী সা.কে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন, হে রাসুল, যারা তাদের ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন ফেরকায় বিভক্ত হয়ে যায় তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয় আল্লাহর কাছে, আল্লাহ তাদের সময়ে বলবেন যে তারা কি করেছে। [সুরা আল আনআম,আয়াত: ১৫৯] এ আয়াতে দেখা যাচ্ছে আল্লাহ তায়ালা আমাদের কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

বিভক্তি সৃষ্টিকারীর সাথে প্রিয় নবীর কোনো সম্বন্ধ নেই বলে আমাদের সতর্ক করাই উদ্দেশ্য। যার সাথে আল্লাহর নবীর কোনো সম্পর্ক থাকবে না তার সাথে ধর্মেরও কোনে সম্পর্ক থাকবে না। তিনি এখন যতই বলুন তিনি ধর্মের কাজ করছেন তিনি মূলত ফেরকার কাজ করছেন। এই সব ফেরকা তৈরির কোনো অবকাশ ইসলামে রাখা হয়নি। তাবলিগের দুপক্ষেরই উচিত ফেরকা সৃষ্টি থেকে বিরত থেকে যার যার মত করে ইসলামের দাওয়াত দেয়া। একে অপরের বিরুদ্ধে না বলে ইতিবাচকভাবে দ্বীনের দাওয়াত দেয়া। আশা করা যায়, তাতে দুদলের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা সত্ত্বেও নদীর দুটি ধারার মতো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সব ধরনের বিভক্তি ও বিবাদ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

লেখক: দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী ইসলামী চিন্তাবিদ

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!