বাংলাদেশ

ফুটবল যুদ্ধের নয়া নাম সৌদি আরব

<![CDATA[

‘যৌবন রে, তুই কি রবি সুখের খাঁচাতে।’ বিশ্বকবির যৌবন সুখের খাঁচাতে বন্দি থাকলেও ফুটবলের যৌবন বসে নেই গণ্ডির মধ্যে। দেশের সীমানা পেরিয়ে মহাদেশ বদল করে ইউরোপ-আমেরিকার ফুটবল এখন এশিয়ার কাঁধে ভর করেছে। আর এশিয়া থেকে সামনের সারিতে বসে বিশ্ব রঙ্গমঞ্চ মাতিয়ে চলেছে সৌদি আরব। গোল বলের এই যুদ্ধে যেন তারাই একসঙ্গে হেক্টর-একিলিস। সৌদি আরবকে নিয়ে দুই পর্বের প্রতিবেদনের আজ থাকছে দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।

প্রতি বছরে এশিয়ার দেশ সৌদি আরব নিজেদের উপার্জনের রেকর্ড ভেঙে চলেছে। যেখানে বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশ ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠিত, সেখানে অর্থ খরচের রাস্তা আবিষ্কারে ঘেমে অস্থির মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। তাই নতুন চিন্তা উদয় হয়েছে দেশটির মাথায়। চোখ পড়েছে ইউরোপ-আমেরিকার ফুটবলে। আর শুধু চোখ রেখেই বসে নেই দেশটি, নিয়মিত রঙিন স্বপ্ন বুনে চলেছেন কর্তারা। অবশ্য সৌদির আগেই সে যাত্রার সফল ভেলা সাজিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যেরই দেশ কাতার। ফুটবলের ২২তম বৈশ্বিক আসর আয়োজন করে দেশটি শুধু চমক তৈরি করেনি, ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য স্বাক্ষর রেখেছে। তাতে কাজটা সহজ হয়েছে সৌদি আরবের জন্য। কতটা সহজ হয়েছে সেটি বোঝা যায় দেশটির ক্লাব আল-নাসরে পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ভেড়ানো দেখে।

স্ট্র্যাটেজিক গিয়ারসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে সৌদি আরব বিগত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত দেখতে পাবে। যেখানে সরকারি ঋণসীমা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। অন্যদিকে দেশটি নতুন এই বছরে তেলখাত বাদ দিয়ে অন্য খাতে বাড়তি নজর রাখবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাচ্ছেন মেসি

রিয়াদভিত্তিক স্ট্র্যাটেজিক গিয়ারসের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিনিয়ত সৌদি আরবের বেকারত্বের হার কমছে। যেখানে নারী শ্রমশক্তির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। চার বছরে ক্রীড়ায় নারীদের অংশগ্রহণ দ্বিগুণ হয়েছে। যা ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা এরইমধ্যে পার করেছে। আর এ বিষয়গুলো ইউরোপীয়দের নজরেও এসেছে। তাতে মুসলিম দেশটির ওপরে ইউরোপের মানুষের নমনীয় চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন ঘটতে দেখা যাচ্ছে।
 

No description available.
২০০ মিলিয়ন ইউরো বেতনে রোনালদোকে দলে নিয়েছে আল নাসর। ছবি সংগৃহীত

এমনিতেই ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণে সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের আকষর্ণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। এরপরে যদি ইউরোপ-আমেরিকার দৃষ্টিও তাদের দিকে ঘোরানো যায়, তাহলে তো ‘একাই একশ’। তবে সে একশ’ পূরণের জন্য আগে এই দুই মহাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠতে হবে। আর সেই সেতুবন্ধনের জন্য হয়তো ফুটবলকেই বেছে নিয়েছে এশিয়ার দেশটি।

পেছনের ইতিহাস বাদে যদি কেবল অদূর অতীতে তাকানো যায়, সেখানে দেখা যাবে ফুটবল নিয়ে অশ্বমেধ যজ্ঞ করে ছেড়েছে সৌদি আরব। প্রথমত স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনাল, দ্বিতীয়ত পিএসজি ও রিয়াদ অলস্টারের মধ্যকার প্রীতি ম্যাচ। এই দুটি খেলা আয়োজন করে পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছে মরুভূমির দেশটি। বিশেষ করে প্রীতি ম্যাচটির কথা না বললেই নয়। যেখানে রোনালদো, মেসি, নেইমার, এমবাপ্পের পাশাপাশি হাজির হয়েছিলেন ভারতীয় সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন। তাতে পৃথিবীর কোটি কোটি উৎসুক চোখ দেখেছে ‘সৌদি ফুটবল নাইট’।

আরও পড়ুন: রোনালদোদের সাবেক কোচ এখন লেভাদের দায়িত্বে

এ ঘটনার আগে রোনালদোকে মরুর দেশে টেনে আনা মহাবিস্ময় জাগিয়েছে। যেই তারকা ইউরোপের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠলেন, সে কিনা এখন এশিয়ার প্রতিনিধি! তার আগে কাতার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আরও বিস্ময়ের জন্ম দেয় বাদশাহ সালমানের দেশ। নিজেদের প্রথম ম্যাচে ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনাকে নাস্তানাবুদ করে, যেই আর্জেন্টিনা শিরোপা নিয়ে ঘরে ফেরে। যদিও সৌদি আরব আর কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি সে আসরে। তবুও যে ইশারা তারা দিয়েছে, তার অর্থ বেশ গভীর। সৌদির সেই জয়ে সরকারি ছুটিও ঘোষণা করেন বাদশাহ সালমান।

বাদশাহ সালমান হয়তো বুঝতে পেরেছেন ফুটবলে যে আবেগ আছে, সেটি অমূল্য। হয়তো সেজন্যই ফুটবল নিয়ে দেয়া হয়েছে সবুজ সংকেত। তাতে বিয়ে না করা রোনালদো থাকতে পারছেন প্রেমিকাকে নিয়ে। শিথিল হয়ে গেছে কঠোর আইনের বেড়াজাল। হতে পারে সৌদির পক্ষ থেকে এটি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটি বার্তা। তবে যাই হোক ফুটবল নিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছে দেশটি, সেটি অল্পতেই শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না।

 

No description available.
কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারায় সৌদি আরব। ছবি সংগৃহীত

রোনালদোর পরে আরও তারকাদের মরুর বুকে ভেড়াতে চায় সৌদি আরব। সেই তালিকায় রয়েছেন বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসিও। যেটি দেখে ফ্রান্সের ক্লাব পিএসজির গলা শুকিয়ে এসেছে। তবে ফুটবলের জন্ম দেয়া ইউরোপও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। এই মুহূর্তে রোনালদোর পরে মেসি হাতছাড়া হলে যে ইউরোপের ফুটবল ঝুড়িতে ছিদ্র তৈরি হবে, এটি তারা ভালো করে জানে। আর এগুলো নিয়ে যেন শুরু হয়ে গেছে অলিখিত ফুটবল যুদ্ধ।

আরও পড়ুন: কোয়ার্টারের লড়াইয়ে মাঠে নামছে বার্সেলোনা

এই যুদ্ধের পারদ শীর্ষে রাখতে সৌদি আরব ২০৩০ সালে ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক হতে চায়। এজন্য কেবল পশ্চিমাদের বাগে আনতে পারলেই দুয়ে দুয়ে চার হয়ে যাবে। ছয়বার ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ এবং এএফসি এশিয়ান কাপে তিনবার শিরোপা জয়ী সৌদি আরবের দলীয় সমৃদ্ধি তেমন কিছু নেই বললেই চলে। তাই নিজের দলের চিন্তা মাথায় রেখে, আপাতত বিশ্ব ফুটবল নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে দেশটি। তাতে যদি নিজেদের ফুটবলে হাওয়া লাগে সেটিতে অবশ্যই ‘পোয়া বারো’ হবে। হতে পারে এটিও সৌদির প্রধান লক্ষ্য।

এরইমধ্যে সৌদি আরবে এক ডজন আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া আরও চারটি আধুনিক স্টেডিয়াম ২০২৬ সালে চালু করা হবে। এতে দেশটির ভবিষ্যৎ লক্ষ্যটা খুব স্পষ্ট। মরুর দেশটি এখন ফুটবল ক্ষেত্রের ভীষ্ম, যুধিষ্ঠির, অর্জুন, কর্ণ কিংবা ভীম-দুর্যোধন সবই হতে প্রস্তুত। ইংল্যান্ড যদি আধুনিক ফুটবলের রূপকার হয়ে থাকে, সৌদি আরব হতে চায় ফুটবলের উত্তর-আধুনিক রূপকার। তাতে ইউরোপ হয়তো মনে মনে বলবে, ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি / রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’

]]>

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!