শিক্ষা প্রকল্পগুলো শিক্ষকের হাতে থাকবে, প্রশাসনের নয়
<![CDATA[
একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নির্ভর করে সেখানের প্রাথমিক শিক্ষা অর্থাৎ হাতেখড়ি কীভাবে হচ্ছে অনেকটা তার ওপর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশে শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের বেতন-ভাতার অবস্থা যাচ্ছেতাই।
একটি শিশুর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগুরু তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। একদলা কাদামাটিকে শিল্পী যেভাবে নিখুঁত হাতে নানা আকার দেন, তেমনি একজন শিক্ষক গড়ে তোলেন একজন কোমলমতি শিশুর জীবনের প্রথম ভাগ। শিক্ষকের হাত ধরেই শিশুশিক্ষার্থীর সামনে উন্মোচিত হয় নতুন দিগন্ত।
কিন্তু আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কতটুকু পাঠদানে যোগ্য, আদৌ যোগ্যরা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন কি না, দেশের শিক্ষা খাতের এমন বেহাল দশা কেন–এ নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্যসমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে।
সময় সংবাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে তিনি তুলে ধরেন দেশের শিক্ষাখাতের নানা অসংগতি, সংকট ও উত্তরণের নানান দিক। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা প্রকল্পে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ১০ জন গেলে সাতজনই থাকে উপসচিব পর্যায়ের প্রশাসনের লোকজন। আমি মনে করি, শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ প্রশাসকের হাতে থাকার কোনো মানে হয় না। এ নিয়ন্ত্রণ থাকবে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের হাতে।’
আরও পড়ুন: পাবলিক মানহীন, প্রাইভেট বাণিজ্যিক
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে আলাপের মূলদিকগুলো:
শিক্ষার সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের শিক্ষা নিয়ে ভাবনার ভেতরে শৃঙ্খলা ও দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। শিক্ষার আদর্শ কী হওয়া উচিত, শিক্ষা কীভাবে একটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতায়ন করতে পারে, একজনকে বুদ্ধি ও মেধার জায়গা থেকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে–আমাদের এতদিন ধরে চলমান শিক্ষাব্যবস্থায় এ চিন্তাধারার অভাব আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও এ সমস্যার আশু কোনো সমাধান আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
আমাদের শিক্ষার সংকটটি দাঁড়িয়ে আছে একরকমের অক্ষমতার ওপর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। প্রতিবেদন জমা দেয়া হয় ১৯৭৪ সালে। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। ১৯৭৫ সালের পর থেকে যে শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে, তা হয়ে গেল বাজারবান্ধব-পুঁজিবান্ধব। একটি ভয়ানক রকমের বিভাজিত সমাজের শিক্ষার শেষ মাথায় যেমনি করে বাজার থাকে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটাও তেমন। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন বাস্তবায়িত হলে আমরা অন্তত বাজারনির্ভর একটি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে জ্ঞানভিত্তিক ও জীবনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করতে পারতাম। জ্ঞানভিত্তিক ও জীবনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সুবিধা হলো, কালের বিবর্তনে এর মধ্যে শক্তি সঞ্চারিত হয়। অন্যদিকে বাজারভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় সময়ের বিবর্তনে বাজারের প্রভাব বাড়তে থাকে, ধীরে ধীরে শিক্ষা হয়ে ওঠে পণ্য।
সারা বিশ্বে এখন নিও-লিবারেলিজমের একটা ঢেউ যাচ্ছে। প্রতিটি দেশেই দেখা যাচ্ছে, পড়াশোনার জন্য যে পাঠ্যক্রম তৈরি করা হচ্ছে, তা নগদ মুনাফার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু শিক্ষা তো হাতে হাতে নগদ লাভ তুলে দেয় না, দেয়ার কথাও নয়। এটা তো কোনো পণ্য তৈরি না-যে তৈরির আগেই বাজারের কথা ভাবতে হবে। শিক্ষার ফলাফল দূরবর্তী। কিন্তু বর্তমানে পুঁজিবাদী সমাজে এটাকে আমরা পণ্যের মতো করেই উপযোগিতা যাচাইয়ের চেষ্টা করছি।
সংকটের আরেকটি কারণ হচ্ছে, শিক্ষাখাতে আমাদের আর্থিক বিনিয়োগের দীনতা। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনে বলা হয়েছিল, শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ করা অর্থের পরিমাণ হবে ৫-৭ শতাংশ, কিন্তু আমরা পাচ্ছি ২ শতাংশের কমবেশি। এতে শিক্ষকদের আমরা এতটাই দরিদ্র অবস্থায় রেখেছি যে, তাদের থেকে আমরা মেধাবৃত্তিক শিক্ষাদানের আশা করতে পারি না। আমরা যদি প্রত্যাশা করি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি পাওয়া এক শিক্ষার্থী প্রাইমারিতে শিক্ষকতা করতে যাবে–এটা তার প্রতি অন্যায় করা হবে। কেননা, সে শিক্ষাই নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক হবে–এমন প্রত্যাশা মাথায় রেখে।
এই-যে বর্তমানে বিসিএসের প্রতি এমন মারাত্মক মোহ, এর কারণ হচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা অর্জন না করে আমাদের এমন এক শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, যেখানে আমাদের মূল লক্ষ্য–নিশ্চিন্তে বাজারে নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। বাজারের একটা বড় অংশ এখন সরকারি কর্মসংস্থান, আর বিসিএস এমন এক কর্মসংস্থান, যেখানে সাধারণত মামা-খালুর মতো আত্মীয়স্বজনের রেফারেন্সের প্রয়োজন হয় না, ক্ষমতাবানদের ধরনা দিতে হয় না। এ পদ্ধতিতে গ্রামের একটি ছেলেও মেধার জোরে বিসিএস ক্যাডার হতে পারে। এ কারণেই এই চাকরি পদ্ধতিটি এত জনপ্রিয় হয়েছে।
যদি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারতাম, যেখানে ভালো বেতন পাওয়া সর্বোচ্চ মানের শিক্ষকের জোগান দেয়া যেত, তাহলে আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত বলতে যে জ্ঞানী ও আত্মসচেতন বুঝি, সেভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হতো। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর দেশে যখন সামরিক শাসন এলো, আমাদের শিক্ষা হয়ে পড়ল উদ্দেশ্যহীন। যখন কোনো সামরিক শাসক ক্ষমতায় আসে, তার কাজ জনকল্যাণমূলক হয় না, সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সে কাজ করতে পারে না। তাকে পশ্চিমা অস্ত্র ব্যবসায়ী দেশগুলোর ধরনা দিতে হয়। বর্তমান সেনাবাহিনীর কথা বললেও এ কথা সত্যি যে আমাদের এখন পর্যন্ত পশ্চিমা অস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত এ ব্যবস্থা কায়েম থাকবে, ততদিন অবধি পশ্চিমা পুঁজিবাদের কালো থাবা আমাদের তাড়া করে বেড়াবে।
’৭৫-পরবর্তী আমরা যে শিক্ষাব্যবস্থা পেয়েছি, তা কিন্তু এ সামরিক বাহিনীর হাত থেকেই এসেছে। তারা ইংরেজি মাধ্যমের ওপর জোর বাড়িয়েছে। ইংরেজি মাধ্যম এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা সমাজের বৈষম্য আরও প্রকট করে তোলে। এতে দেখা গেছে, যাদের পর্যাপ্ত অর্থসংস্থান রয়েছে, অর্থাৎ যারা উচ্চবিত্ত, তারা এ মাধ্যমে পড়াশোনা করে বাজারের জন্য উপযোগী হয়েছে। অন্যদিকে মধ্যবিত্তরা বাংলা মাধ্যমে পড়ে সংস্কৃতমনা হয়েছে বটে, তবে চাকরির বাজারে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাকি থাকল নিম্নবিত্ত, যাদের আমরা মাদ্রাসায় ঠেলে দিয়েছি, যা নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দখলে আছে। এখানে না আছে জ্ঞানের বিকাশ, না বাজারের উপযোগিতা; বরং একধরনের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রভাব, যা শিক্ষার্থীদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখা যাচ্ছে, একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ধর্মশিক্ষা নিয়েও পরবর্তী সময়ে বিচারপতি, ডাক্তার, প্রকৌশলীর মতো বড় বড় পদে নিজেকে নিয়ে যেতে পারছে। আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষাকে এভাবে আধুনিক করতে পারেনি। যদি পারতাম, তাহলে নিম্নবিত্ত এসব শিক্ষার্থীকেও একটি আশার আলো দেখাতে পারতাম আমরা।
কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন বাস্তবায়িত না হওয়ায় শিক্ষার চাবি চলে গেল বিত্তবানদের হাতে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশে পাড়ি জমানো। কিন্তু একটা সময় যখন সেটিও আর আগের মতো সুবিধাজনক জায়গায় থাকল না, তারা নিজেদের জন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করল। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পাঠ্যক্রমের সমস্যা নয়। এটা সাময়িক ও সমাধানযোগ্য। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে, আমরা মানসম্মত শিক্ষক পাচ্ছি না। এতে যে শিক্ষা দেবে তার থেকেই আমরা সুশিক্ষার আশা করতে পারছি না। বর্তমানের শিক্ষকরা শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে না দেখে, দেখছে পেশা হিসেবে–এটা আমাদের শিক্ষাখাতে অনেক বড় একটি সমস্যা।
বর্তমানে আমরা এমন কোনো শিক্ষক পাচ্ছি না, যে নিজে একটি সংস্কৃতিকে ধারণ করে এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রবর্তী একটি জায়গায় কল্পনা করে শিক্ষাদান করে যাচ্ছে। আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড় করানো দরকার ছিল, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শিখতে শুরু করবে। তাদের জোর করে শিক্ষাদান কিংবা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ভয় দেখিয়ে শিক্ষাদান করতে হবে না।
উদাহরণস্বরূপ নরওয়ের একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা বলি। এটি আমার সামনে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। দেখলাম, স্কুলের বাচ্চাদের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হলো। ওদের বলা হলো, তোমরা প্রজাপতি দেখতে চেয়েছিলে, এবার স্বচক্ষে দেখে নাও। ওরা প্রজাপতি দেখল, ছবি তুলল, নিজেদের মতো করে আনন্দ-উল্লাস করল। পরে স্কুলে ফিরে এসে ইন্টারনেট ঘেঁটে কোনটা কোন প্রজাতির প্রজাপতি, তা নিয়ে পড়ালেখা করল। পরদিন এটার ওপরই ওরা প্রেজেন্টেশন দিল। এই যে একটা শিক্ষা পদ্ধতি, এটা কিন্তু আমাদের গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতির থেকে ভিন্ন ও চমৎকার। দুপুরে ওদের সঙ্গে খাবার খেলাম আমি। দেখলাম, বাচ্চারা নিজেদের খাবার সুশৃঙ্খলভাবে প্লেটে তুলে নিচ্ছে। যে যতটুকু খাবে ততটুকুই নিচ্ছে। খাবার শেষে টেবিলের ওপর জমে থাকা উচ্ছিষ্টটাও ওরাই পরিষ্কার করছে। এতে এক খাওয়া থেকে ওরা শিখছে শৃঙ্খলা, সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া থেকে শিখছে সমতা। এটা কিন্তু আমাদের এখানে হয় না। ওদের নিজেদের একটা ‘ডিসিপ্লিন ক্লাব’ আছে, যেখানে শেখানো হয় একজন অন্ধ মানুষ রাস্তা পারাপারের জন্য দাঁড়িয়ে আছে, তাকে কীভাবে সাহায্য করতে হবে। লিফটের সামনে কিংবা বাসে একজন বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ কেউ দাঁড়িয়ে আছে, তাকে কীভাবে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। এটাই কিন্তু শিক্ষার একটি মৌলিক দিক। বিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ওদের এই মৌলিক বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখানো হচ্ছে। একদিকে বাস্তবমুখী শিক্ষা, অন্যদিকে নৈতিক শিক্ষা–দুইয়ে মিলে শুরু থেকেই ওরা ধীরে ধীরে শিক্ষিত হয়ে উঠছে। আমাদের বেলায়ও কিন্তু এটা হওয়া উচিত, কিন্তু হচ্ছে না।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ মুখস্থনির্ভর। এটা কোনো শিক্ষা নয়। আমরা শিক্ষার নামে শিশুদের মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ করে তুলছি। সক্ষমতা শেখানোর নামে আমাদের বিদ্যালয়ে যা শেখানো হয়, তাতে তারা উল্টো অক্ষম হয়ে পড়ে। আমাদের শেখানো হয়, শিক্ষক নোটে যা লিখবে, পরীক্ষার খাতায় সে অনুযায়ী লিখতে হবে। কিন্তু এটা হওয়া তো উচিত নয়। এতে একজন শিক্ষার্থী নিজে কী শিখল সেটা বড় না হয়ে বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে শিক্ষক তাকে জোর করে কী ধরনের বিদ্যা শেখাল সেটি। এতে দিনকে দিন বিদ্যালয়ই একটি শিশুর মানসিক বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, যা কখনোই কাম্য নয়।
এবার আসা যাক বৈষম্যের দিকে। একটি হাওড়াঞ্চলের শিশু বিদ্যালয়ে যা শিখছে আর ঢাকার একটা শিশু যা শিখছে, তাতে আকাশ-পাতাল তফাত। এটা যে একটি বড় রকমের সমস্যা, রাষ্ট্র সেটি স্বীকারও করছে না, এ নিয়ে কাজও হচ্ছে না। আমরা ধরেই নিয়েছি, এতদিন এভাবে চলে এসেছে, সামনের দিনগুলোতেও এভাবে চলবে। আমরা এমন এক শ্রেণিশাসিত সমাজে আছি, যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে সুশাসনের অভাব। এখানে শিক্ষা নিয়ে কারচুপি হয়, শিক্ষাকেন্দ্রিক প্রকল্পগুলোর ফল শিক্ষার্থী ও শিক্ষক পায় না, পায় শিক্ষা কর্মকর্তা ও তাদের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। বিদেশে প্রশিক্ষণের কথা বলি–ট্রেনিংয়ে যাওয়ার কথা শিক্ষকদের, যাচ্ছেন উপসচিব পর্যায়ের কেউ একজন। হয়তো তিনি তিন সপ্তাহের জন্য বিদেশ ঘুরে এলেন, আমাদের কাজের কাজ কিছুই হলো না। আমাদের এখানে শিক্ষা প্রকল্পে প্রশিক্ষণের জন্য বাইরে গেলে ১০ জনের মধ্যে সাতজনই থাকে উপসচিব পর্যায়ের লোকজন। আমি মনে করি, শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ প্রশাসকের হাতে থাকার কোনো মানে হয় না। এ নিয়ন্ত্রণ থাকবে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের হাতে। আমাদের এমন শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও চিন্তক তৈরি করতে হবে, যাদের প্রকল্প বোঝা ও পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা আছে।
শিক্ষাখাতে আমাদের একটি সুশৃঙ্খল নীতি দরকার । ২০১০ সালের যে শিক্ষানীতি, এটাও কিন্তু বাস্তবায়ন হলো না। যা আছে সব কাগজে-কলমে, বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ কিংবা ব্যবহার নেই। সংকট মোচনের সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা। রাষ্ট্রকে শিক্ষাখাতকে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে স্বীকার করতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। আমাদের শিক্ষার মূলনীতিতে বড় রকমের পরিবর্তন আনতে হবে। মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও সনদনির্ভর শিক্ষাকে বাদ দিয়ে আমাদের আত্ম-উন্নয়নমূলক শিক্ষার দিকে এগোতে হবে। সেটি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীর সক্ষমতা বাড়বে, জ্ঞানের সক্রিয়তা বাড়বে ও জ্ঞান উৎপাদনের বিষয়টি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ভাগাভাগি করে নেবেন। এখানে শিক্ষকের মূল দায়িত্ব শেখানোর থেকেও, যা শেখাচ্ছেন তা কতটুকু কার্যকর হলো ও শিক্ষার্থীরা প্রতিদান হিসেবে দ্বিগুণ ফেরত দিতে পারল কি না, সেদিকে নজর দেয়া। শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ ও মেধাসম্পন্ন শিক্ষকের সাহায্যেই আমাদের শিক্ষাখাতকে পুনরুজ্জীবীত করে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
]]>




